“মোর সংসারে তাণ্ডব তব কম্পিত জটাজালে।
লোকে লোকে ঘুরে এসেছি তোমার নাচের ঘূর্ণিতালে।
ওগো সন্ন্যাসী, ওগো সুন্দর, ওগো শঙ্কর, হে ভয়ঙ্কর,
যুগে যুগে কালে কালে সুরে সুরে তালে তালে,
জীবন-মরণ-নাচের ডমরু বাজাও জলদমন্দ্র হে॥
নমো নমো নমো--
তোমার নৃত্য অমিত বিত্ত ভরুক চিত্ত মম”
রবীন্দ্রনাথের এ গানের প্রতিটা পদ বিশ্বরূপ দর্শনের মত সুন্দর ভয়ংকর। প্রতিটা পদ নিয়ে ভাবতে গেলে বিস্ময়ের অবধি থাকে না। যেন মন্ত্র। যেন সামগান।
শরীরে ব্যধিতে জর্জরিত, মন নানারকম উদ্বেগ-বিষণ্ণতা-ভয়-আতঙ্ক-ঈর্ষা-বিরহ পীড়িত, বুদ্ধি বিভ্রান্ত, পরিবারে সদাকলহ, কাজের জগতে নানাপ্রকার ষড়যন্ত্র-কূটকৌশলের ফাঁদ, সামাজিক জগতে অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা, অবমূল্যায়ন, শ্রেণী-গোষ্ঠী দ্বন্দ্ব। এর মধ্যে সুখ শান্তি কোথায়? এইগুলোর কোনো একটা দিক ঠিক চললেই মানুষ বলে, ভালো আছি দাদা, তোফা আছি। কিন্তু সেও জানে এ ভালো থাকার আয়ু বেশিদিনের নয়।
মানুষ জানে কারা যেন সুখে আছে। কারা যেন সুখী ছিল। সেই মৌসুমি ভৌমিকের গানের মত, “আমি শুনেছি সেদিন তুমি”। কিন্তু তারা কারা? হয় তো তাদের খোঁজ আজও গানের স্রষ্টা করে চলেছেন। তাদের পাওয়া যায় না।
সময় আমাদের নিয়ে পুতুলখেলা খেলায়। কখনও কখনও আমাদের বোধ হয়, আহা এই তো সব ঠিক চলছে, সব আমার নিয়ন্ত্রণে আছে, এভরিথিং ইজ আণ্ডার মাই কন্ট্রোল। সব মোহের মূল এই বাক্যটি - আমি চাইলেই সব ঠিক করতে পারি, আমি চাইলেই সব নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। পারি, সর্বাংশে মিথ্যা নয়, কিন্তু সেটা সময় যদ্দিন সময় দেয় তদ্দিন। তারপর পাশ ফিরিয়ে দিতেও কারোর সাহায্য লাগে, মানুষ এমন বিবশ হয়ে যায়। কিন্তু আমরা সবাই ভাবি, অন্তত বিশ্বাস করতে চাই, সে আমার বেলায় হবে না। কিন্তু হয় তো।
রবীন্দ্রনাথের লেখায় আরেকটা প্রার্থনা বারবার এসেছে, উপনিষদের প্রার্থনা - হে রুদ্র তোমার প্রসন্ন মুখখানা যেন আমি দেখি, আমি পাই। সেই আমাকে পালন করুক।
প্রসন্নতা - সংসারে সব চাইতে মহার্ঘ্য বস্তু। প্রসন্নতা থেকেই প্রসাদ জন্মায়। প্রসাদ ময়রার হাতে জন্মায় না, চিত্তে জন্মায়। সে পেয়ে মানুষের কী হয়? ঋষি বললেন, যা পেয়ে মানুষ তৃপ্ত হয়, আনন্দিত হয়, শান্ত হয়। সে কী তবে? প্রসন্নতা।
কিন্তু সে জন্মায় কী করে? কোনো স্বর্গীয় ঈশ্বরের কথা বলেন না উপনিষদের ঋষিরা। তাঁরা বলেন সে জন্মাবে তোমার আত্মলাভের শান্তিতে। তাঁকে পেলে সব পাওয়া হবে। আবার অন্যদিকে বার্ট্রান্ড রাসেলের মত মতাবলম্বী মানুষেরা বলেন নিজের ভেতরে বাইরে যতক্ষণ না “হারমোনি” প্রতিষ্ঠা হচ্ছে ততক্ষণ সুখশান্তি নেই জীবনে। কথা এক। আত্মলাভ আর আত্মজ্ঞান একই কথা। জুতো কিনতে গেলে তা জুতোর দোকানির ইচ্ছা অনুযায়ী কিনে লাভ নেই, বা অন্যের জুতো দেখে লোভে পড়ে সেই মাপের কিনেও লাভ নেই। নিজের পায়ের মাপ জেনে সেই মাপ অনুযায়ী জুতো কিনে পরলেই সুখ। নিজেকে জানার সেই সুখটাই আত্মপ্রসাদ, সন্তুষ্টি, আত্মজ্ঞান, প্রজ্ঞা, সংহতি, হারমনি ইত্যাদি যে নামেই ডাকি না কেন। আর বাদবাকি যা গণ্ডগোল আর ডামাডোল সংসার জুড়ে ভেতরে বাইরে, তারা সব প্রশিক্ষক, ট্রেনার। ওই অবধি নিয়ে গিয়েই ছাড়বে। বিবেকানন্দ বলেন এ সংসার একটা বিরাট ব্যায়ামগার। কথা তো তাই। বুঝেছি না, বুঝতে বুঝতে চলেছি - এই খাঁটি কথা।