Skip to main content

 

সুখ নিশ্চল। সুখ বিস্মরণে টানা আবরণ। সুখ অধৈর্য শ্রোতা। সুখ অগভীর দ্রষ্টা। তবু তো সুখ, সুখ। ছেড়ে গেলে হয়। কিন্তু যাই না তো। সুখের সীমানাকে বলি, অ-সীম। এভাবেই মিথ্যার সঙ্গে আপোষ জাগায় সুখ।

বুকে ব্যথা চারদিন ধরে। চিকিৎসক বলল, যাও, হাসপাতালে যাও। স্ত্রী বলল, কথা শোনো না কেন। সে বলল, কমে যাবে। তার দম ফুরায়, বুকে চাপ ধরে, মাথা ঘোরে, ঘাম হয়, বুক ধড়ফড় করে। সে বলে, ঠিক হয়ে যাচ্ছি।

বিয়ে করেছিল যে মাসে, সে মাসে পলাশের রঙ লাল। শিমুলে শিমুলে মাটি হয়ে আছে লাল। সেদিন সুখ ছিল না। স্বপ্ন ছিল। সুখের স্বপ্ন। উনুনে আঁচ দিলে যেমন ধোঁয়া ধোঁয়া, তেমনভাবে স্বপ্ন গেল মিলিয়ে, সুখ থাকল আঁচের মত গনগনে। এবার কাজ এ সুখকে জাগিয়ে রাখা। সুখ তার সব কাড়ল ধীরে ধীরে। তার চিন্তা, তার শান্তি, তার বিশ্বাস, তার রুচি, তার অবসর, তার দুঃখ, তার অপমান, মান সব নিল সুখ। সুখ তাকে একা করে ভরে দিল সংসার। আত্মীয় বাড়ল। আত্মজ, আত্মজা এলো কোল, ঘাড় বেয়ে। সে বলল, আমি কই? নিজেরই প্রতিধ্বনি শুনল বছরের পর বছর পেরিয়ে গিয়ে।

বুকে ব্যথা বাড়ল যেদিন, সেদিন ফাল্গুন দাঁড়িয়ে দোর গোড়ায়। পলাশে, শিমুলে যে কানাকানি, সে আজ তার সঙ্গে নয়। বেলায় নিয়ে এলো এলাহি বাজার। মাছ, মাংস, মিষ্টি, ফল। বলল আজ তরিজুত করে খাব। রাঁধো। ওবেলার জন্যেও রেখো। ডাকতে চাইলে ডাকো আত্মীয়, অতিথি। তোমার বুকে ব্যথা? না, না, নেই তো আর। সেরে গেল কবে। বুকের মধ্যে হাপর! গলার কাছে চাপচাপ। বাঁ হাত ধরে টনটনে ব্যথা। তবু কী যেন একটা সেরে যাচ্ছে। সুস্থ হচ্ছে সে।

দুপুরে খেয়ে গেল শুতে। পাশে শুয়ে আত্মজা। বাইরে যখন কোকিল ডেকে উঠল পঞ্চম ছুঁয়ে, তার বুকের মধ্যে যেন নাড়ি ছিঁড়ে গেল হুতাশে। চোখ উঠল নীচের পল্লব ছেড়ে উপর পল্লবের দিকে, যেদিকে রাখা আলনা জোড়া শাড়ি, কত তার রং। আরো আছে, তার নিজের কয়েকটা জামা। বেমানান। আত্মজা উঠল চমকে, মা তাড়াতাড়ি এসো, বাবা কেমন করছে। সবাই এলো দৌড়ে। গাড়ি এলো মাথায় লালঝুঁটি। সবাইকে বলল সরো সরো, আজ আমাদের যমে মানুষে টানাটানি। ডাক্তার বলল, এমন নিথর শরীর, কী করব নিয়ে, যাও ফিরে যাও বাড়ি।

মৃত শরীরের কোনো গৃহ হয় না। তাকে নেয় আগুন, জল, মাটি। যারা কেউ সুখী নয় কোনোদিন। সে যখন যাচ্ছে অন্তিম সাজে, অন্তিম যাত্রায়, পশ্চিমে ফাল্গুনের সূর্য পড়েছে ঢলে, তাকে পরম আদরে ছুঁয়ে। পলাশ পড়ল তার বুকে। শিমুল ছুঁলো শিরে। পায়ের উপর বসল রঙিন প্রজাপতি। সব সুখ ছেড়ে সে চলে যাচ্ছে একা। স্মিতহাস্য মুখে। প্রেম এসেছে এতদিনে তাকে চিনে, সে যখন সুখের কারাগার ছেড়ে আবার চলেছে একা। গন্তব্যহীন ছন্দের তালে নেচে।