Skip to main content

 

বিয়ের আগে ছিল কল্যাণী আইয়ার। বিয়ের পর হল কল্যাণী বসাক। শান্তিনিকেতনে পড়াশোনা। সংগীত ভবনের ছাত্রীও। সেখানেই পরিমলের সঙ্গে আলাপ। পরিমল রেলে চাকরি নিয়ে কাঁচরাপাড়া এলো। বিয়ে করল। অবসরের পর কল্যাণীতে বাড়ি করে এল। এখন কল্যাণী একা। স্বামী মারা গেছে। ছেলে জার্মানে থেকে গেল।

কল্যাণী গান শেখাত। কোভিডের আগে অবধি শিখিয়েছে। এখন দম পায় না।

আজ দোল ছিল। সকালে অনেক পুরোনো ছাত্রছাত্রীরা এলো। আবীর দিল। কথা হল। গান হল। ওরাই রাঁধল। খাওয়াদাওয়া হল।

এখন সাতটা বেজে দশ। কল্যাণী বাড়ির সামনে একটা চেয়ারে বসে। নারকেল গাছের ফাঁক দিয়ে দেখছে পূর্ণিমার চাঁদ উঠছে। সেই চাঁদ। জন্ম কেরালার একটা গ্রামে। বাবা স্কুল শিক্ষক ছিলেন। বাবার ইচ্ছাতেই শান্তিনিকেতনে আসা। সেদিনের সেই দোলের চাঁদ শান্তিনিকেতনেও উঠল। বিয়ের পরে কাঁচরাপাড়ায় উঠল দোলের চাঁদ। কল্যাণীতেও বাদ গেল না। সঙ্গে সঙ্গে এলো রবীন্দ্রনাথের গান। আজ কেউ নেই। রবীন্দ্রনাথের গান আর এই দোলের চাঁদ ছাড়া।

কত কী বদলে গেল! মানুষের হাতের নাগালে কত সুখ। কিন্তু এমন দুঃখী, এমন অশান্ত, এমন অস্থির যেন মানুষ আগে ছিল না। মানুষের রোগের কত কত চিকিৎসা ব্যবস্থা! অথচ শরীর নিয়ে এমন আতঙ্ক, এমন উৎকণ্ঠা যেন আগে ছিল না। এমন বৈপরীত্য কেন?

সুচিত্রা মিত্র চলছে, “এই উদাসী হাওয়ার পথে পথে মুকুলগুলি ঝরে……”

কল্যাণী চোখটা বন্ধ করে বসে। মানুষ যেন বুদ্ধিসর্বস্ব হয়ে গেল। অনুভব পড়ে থাকল মাটিতে। অনাদরে। বুদ্ধিসর্বস্ব হলে মানুষ দুঃখবিলাসী হয়। তার সব কাজে সেই দুঃখবিলাসের ছায়া। বড় শুষ্ক। কৃত্রিম। কল্যাণী হাতের উপর হাত রাখল।

"দুজনের কানাকানি কথা দুজনের মিলনবিহ্বলতা, / জ্যোৎস্নাধারায় যায় ভেসে যায় দোলের পূর্ণিমাতে।"

মানুষের সুখ জন্মায় দুঃখের ক্যানভাসে। যার দুঃখ নেই, তার সুখ কই? দুঃখকে এড়িয়ে সুখকে কামড়ে ধরে থাকা, হয়?

চাঁদটা এতক্ষণে সাদা হল। কল্যাণী চুপ করে বসে। গাছের পাতার শব্দ আসছে। রাত নামছে। একে ঠেকাবে কে? এ দিনরাত্রি, সুখদুঃখ, শীত-গ্রীষ্ম বর্ষা-বসন্তের ছন্দ থেকে জীবনের ছন্দকে ছিঁড়ে আলাদা করে কী চাইছে মানুষ?

সামনের আবাসনে পার্টি হবে। অদ্ভুত ভোজপুরি গান শুরু হল। অশ্লীল ভাষা। ওরা নাচছে। অথচ সবাই বাঙালি। দৈন্যকে জানান দিতে হয় না। সে নিজেই ধুলো উড়িয়ে রাস্তায় শুয়ে নিজেকে জানান দেয়।

কল্যাণী ঘরে গিয়ে দরজা জানলা বন্ধ করল। চাঁদ বাইরে। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে চাঁদ শান্তিনিকেতনের মাটিতে একা একা হাঁটছে। দোলের পূর্ণিমাতে। নিঃশব্দে। এ নিস্তব্ধতার বাস্তবতা জীবনের শেষ সম্বল। ফুরায় না। অল্প একটু যত্ন চায়। আজীবন।