Skip to main content

 

333.jpg

 

প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে লোকটা ভ্যানের তলায় ঘুমিয়ে। যেন শেষ নিঃশ্বাসটুকু অনেক আগেই ফেলে শেষ কাজ সেরে রেখেছে। ময়লা গা। কোমরে এক চিলতে কাপড় জড়ানো। দেখে মনে হচ্ছে কোনো বড়লোক মহিলার ফেলে দেওয়া নাইটির অংশ। লোকটা হাঁটু দুটো বুকের কাছে জড়ো করে আছে। এইমাত্র কেঁপে উঠল একবার। হয় তো নাকে বা চোখের পাতায় মাছি বসেছে।

ভ্যানটা রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে দুদিন হল। ময়লা ফেলার ভ্যান। না, এই সেই লোক না যে লোকের দরজায় দরজায় গিয়ে ময়লা তুলে আনে। সে অন্য লোক। শুনেছি সে সরকারি কোনো হাসপাতালে শুয়ে আছে। কী হয়েছে জানি না। তার কী হবে সে নিয়েও উৎসাহ নেই। কিন্তু তার জায়গায় কাজে কাউকে না নিলে পাড়ায় অশান্তি বাধবে এই নিয়ে একটা উদ্বেগ সবার আছে। সবার মানে পাড়ার কর্মকর্তাদের।

ভ্যানের পেছনে ঢাই করা পুরোনো খবরের কাগজের স্তূপ। কত খবর, কত মতামত তর্ক, বিনোদন। কত খাবার সিনেমা সেলিব্রিটিদের গল্প। এ লোকটার কোনো উৎসাহ নেই। এমন না যে পড়তে জানে না। খুব জানে। কিন্তু পড়বে না। ওর উপরেই একটা বড় নার্সিংহোমের বিজ্ঞাপন। ডাক্তারেরা হাসিমুখে দাঁড়িয়ে। কত অল্প বুক চিরে হার্টের সার্জারি করতে পারে সেটাই বলছে। ভীষণ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলছে। লোকটার সে আত্মবিশ্বাস নেই। এমনকি ও এই হাসপাতালে কোনোদিন যাবেও না। রাস্তার উল্টোদিকে এ শহরের বিখ্যাত ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলের পেছনের দরজা। এদিক দিয়েও কেউ কেউ যাতায়াত করে। এ লোকটার ওতেও কোনো উৎসাহ নেই। ইংরেজি পড়তে যে পারে না তা নয়, বেশ পারে। কিন্তু ওর কিছুতেই কোনো উৎসাহ নেই।

ওর বাঁদিক বরাবর হেঁটে গেলে বেশ বড় মাঠ। এই মাঠে রাজনৈতিক সভা হয়। ধর্মীয় সভা হয়। মঞ্চ থেকে দাঁড়িয়ে বড় বড় মানুষেরা কত ভালোমন্দ কথা বলে। মাইক কতদূর অবধি দেওয়া থাকে। এ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ওদের দেখে। ওরা যদি এর চোখের দিকে তাকাতো ভুল করেও, আমি হলফ করে বলতে পারি সেই মুহূর্তে ওর ফাঁসির হুকুম হত। এত অবিশ্বাস ওর চোখে। মঞ্চের লোকরা নীরব অবিশ্বাস সহ্য করে না। নেতা আর ভগবানের লোকেরা দুজনেই চটে ওতে।

আচ্ছা মঞ্চের কথা ছাড়ো। এই মাঠেই প্রতিবাদ সভা, অনশন সভাও তো বসে। তাদের কথায় নতুন নতুন কত প্রতিশ্রুতি, শপথ। মাঠের দক্ষিণ দিকে যে অশ্বত্থ গাছটা, তার ডালে বসে কাকের দল পর্যন্ত শোনে ওদের কথা। সাংবাদিকদের মত ঘাড় কাত করে করে তাকায়। যদিও সাংবাদিকদের মত ওরাও অন্য কোথাও আরো তাজা খাবারের গন্ধ পেলে উড়ে যায়। সে যাক। আরে ভাই তুই তো সাংবাদিক নোস। কোনো সংবাদেই তোর তো আর কিছু আসে যায় না। তুই অন্তত ওদের পাশে বসে যা। প্রতিবাদ সভায় যা চা জলপানি আসে তার থেকে দুটো তুইই তো পাবি। তাই খা। সে করবে না। বরং এদের গন্ধ শুঁকে চলে যাবে। তারপর এরাই যখন কোনো আর্ট গ্যালারি কী শৌখিন আলোচনা মঞ্চে বসবে, ও পা টিপেটিপে যাবে। আর ওদের পোশাক, সুন্দর সাজানো কথাগুলো শুনে মুখ টিপে টিপে হাসবে।

এ আসলেই অসহ্য। এ শহরে অনেকেই চায় এর সৎকার করে একটা বড় ভুরিভোজের আয়োজন করুক। কিন্তু সে সুযোগ যে কবে আসবে।

সেদিন ছিল পূর্ণিমা। এ গঙ্গার ধারের রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বারবার ডাকছিল, হুক্কাহুয়া….হুক্কাহুয়া। গঙ্গার পাশের ঝুপড়িগুলোর পাশ দিয়ে যেতে যেতে ডাকল, ভেউ ভেউ…. কেঁউ কেঁউ…..। তারপর গঙ্গায় নামল। গলা জলে দাঁড়িয়ে উত্তরের দিকে মুখ করে কী বিড়বিড় করে বলতে লাগল। দূর থেকে মনে হবে মন্ত্র পড়ছে। আদৌ তা নয়। ও ওর বংশতালিকা পড়ছে। ওর বিগত বন্ধুদের নাম পড়ছে। ও ওর স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকাদের নাম পড়ছে।

এই সময়েও অনেকেই চায় ও জলের স্রোতে তলিয়ে যাক, ভেসে যাক। কিন্তু ও যায় না। আসলে এ শহরেই কেউ কেউ চায় না ও ভেসে যাক। বরং ওরা চায় ও পরিষ্কার জল নিয়ে আসুক। এ শহরে অনেকে তৃষ্ণার্ত। ভীষণ তৃষ্ণার্ত। ও তাদের জন্য জল আনুক। কিন্তু ওর ময়লা হাত। আনলেও কে পান করবে? কার এত স্পর্ধা! যদি প্রাণে না বাঁচে ওর হাতের জল পেয়ে? এ দ্বন্দ্বের ফেরে সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে অনেকে। অনেকে ফিরে গেছে। অন্য দলে। অন্য কোনো দুঃস্বপ্নের সংসারে।

লোকটার আশেপাশে কোনো দুঃস্বপ্ন নেই। এটা ভীষণ আশ্চর্যের। গভীর অন্ধকারে যখন চুপ করে বসে থাকে, মনে হয় যেন কী গভীর অন্ধকারের ধ্যানে ডুবে ও। অন্ধকারের পর অন্ধকারের স্তর পেরিয়ে যাচ্ছে ও। স্বর্গ মর্ত্য পাতাল সব ছাড়িয়ে যাচ্ছে। যেন সব উঁচু উঁচু বাসা যা গাছের মগডালে বাঁধা, সব ঝরে ঝরে পড়ছে। চারদিক যেন কী একটা লণ্ডভণ্ড হয়ে যাচ্ছে। ধুলোয় ধুলো চারদিক। তার মধ্যে থেকে ভেসে আসছে বাচ্চাদের খিলখিল হাসির শব্দ। সেই ধুলো আর হাসির শব্দে কেউ কেউ চীৎকার করছে, ওরে আগুন লেগেছে রে….আগুন…সব পুড়ে গেল গো….সব জ্বলে ছাই হল.। কেউ বলছে চোখের মাথা খেয়েছেন নাকি মশায়, এ তো বন্যা….কী জলের তোড়….সব ভেসে গেল গো….সব ভেসে গেল। কেউ শুনছে না হাসির শব্দ…. কেউ দেখছে না বাচ্চাগুলো দামাল হয়েছে ধুলোকাদা মেখে।