Skip to main content

 

ভারতীয় চিন্তাধারা, জার্মান চিন্তাধারা, জাপান চিন্তাধারা ইত্যাদি কথাগুলো বাইরের কথা। মানুষের চিন্তাধারার দুটো প্রধান দিক আছে। এক, ডগম্যাটিক; দুই, প্র্যাগম্যাটিক বা ওপেন মাইণ্ডেড ফ্লেক্সিবল।

যে ডগম্যাটিক সে জানে তার জ্ঞান, তার বিশ্বাস, তার অনুভব, তার সমাজ, তার ধর্ম, তার যাবতীয় যা কিছু ধ্রুবসত্য, অভ্রান্ত। অর্থাৎ বেশ কড়া অনমনীয় অবস্থান। এই চিন্তার একটা বড় সুবিধা হল মানসিক স্বস্তি। অত্যন্ত উৎসাহ বিশেষ করে ধর্ম, রাজনীতি, সমাজনীতি বিষয়ে। এই উৎসাহ দুই ধারার হয়। এক, যদি অনুকূল পরিবেশ পরিস্থিতি হয় তবে জি-জান লড়িয়ে সেটাকে সফল করে তোলা; আর যদি তার প্রতিকূল অবস্থানে কেউ থাকে তবে ধনেপ্রাণে তাকে সমূলে উৎপাটন করার অতিচেষ্টায় থাকা। কারণ তার অস্তিত্ব তার নিজের অস্তিত্ব সংকটের কারণ। বিনা প্রশ্নে মেনে নেওয়া ডগম্যাটিজমের একটা প্রধান বৈশিষ্ট্য। সেই বিনা প্রশ্নে মেনে নেওয়ার আনুগত্য জীবনকে অতীতের গৌরবের সঙ্গে তাকে যুক্ত করে। যে গৌরবময় অধ্যায়কে সে ভীষণভাবে বিশ্বাস করে, এবং কোনো বিরুদ্ধ প্রমাণ যুক্তিকে অগ্রাহ্য করে সে নিজের শান্তিসৌধকে অক্ষুণ্ণ রাখতে চেষ্টা করে। তাছাড়া বিনা প্রশ্নে স্বীকার করে নিলে এই সংকটময় বর্তমান জগতের অস্থিরতা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা যায়। এ-ও কী কম বড় পাওয়া?

ভারতে কিন্তু এই ডগম্যাটিজমের পাশাপাশি অনেকান্তবাদ, শায়েদবাদ, অনাত্মাবাদ ইত্যাদিও এসেছিল। অর্থাৎ এবার আমি চিন্তাধারার অন্যদিকের কথা বলছি। ইংরেজিতে কয়েকটা শব্দ আছে, স্কেপটিসিজম, ফ্যালিবিলিজম ইত্যাদি। আসলে চার্লস স্যান্ডার পার্স বলে যে দার্শনিক এই 'ফ্যালিবিলিজম্‌-এর জনক বলা হয় সে কথাটা তো পুরোপুরি ঠিক নয়। মানুষের চিন্তাধারায় সংশয়ের গোড়াপত্তন বহু আগে সক্রেটিস প্রমুখের হাত ধরে হয়েই গেছে। আমি ঠিক আস্তিক, নাস্তিকের তর্কে যাচ্ছি না। সক্রেটিস আস্তিক ছিলেন। আমি বলছি যে আমি যা জানি, যা বিশ্বাস করি, যা ধ্রুবসত্য বলে জানি, সেটা কি আদৌ তাই? এই প্রশ্নে সেদিনের এথেন্সকে জেরবার করেছিলেন সক্রেটিস। আপাত সত্যকে প্রশ্নের পর প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে নাজেহাল করে তুলেছিলেন সেদিনের তরুণ প্রজন্মকে।

"The fundamental cause of the trouble is that in the modern world the stupid are cocksure while the intelligent are full of doubt." কথাটা বার্ট্রান্ড রাসেলের। বহু উদ্ধৃত উক্তি।

সমস্যা হল, আমি যদি ডগম্যাটিক না হই তবে আমি “ভীষণ সত্যি”, “চূড়ান্ত সত্যি”, অতি-উৎসাহ, উচ্ছ্বাস ইত্যাদি অনেক কিছুই নিজের মধ্যে খুঁজে পাব না। বুদ্ধ যখন বলছেন কোনো প্রথা, বিশ্বাস বহুযুগ ধরে বহু মানুষ মেনে আসছে বলেই সেটা সত্যি হয়ে যাওয়ার কারণ হতে পারে না, তখন আমার হোঁচট খাওয়াটা অনেকের কাছে ঔদ্ধত্য।

মানুষের কোনো জ্ঞান ধ্রুব নয়, অভ্রান্ত নয়। মুক্তির এতবড় কথা আর দুটো হতে পারে না। প্যারাডক্স হল, এই দুটো কথা অভ্রান্ত এবং ধ্রুব। মানুষ ভুলের পর ভুল করে, গোঁড়ামি থেকে গোঁয়ার্তুমি সরিয়ে “রাহে আক্‌ল”-এ আসার চেষ্টা করেছে। "রাহে আক্‌ল" আকবরের সর্বধর্ম পর্যালোচনার ইবাদতখানার অনুশীলন ছিল। বুদ্ধ, জৈন, চার্বাক ইত্যাদি দর্শনেও বারবার এই ডগম্যাটিক দৃষ্টিভঙ্গী থেকে বেরিয়ে এসে পর্যবেক্ষণের দিকে জোর দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল।

আজ সমস্যা হচ্ছে, কেউ নন-ডগম্যাটিক কথা বললেই ধরে নেওয়া হচ্ছে সে রাজনৈতিকভাবে বামাচারী। আদৌ নয়। তার একটা উজ্জ্বল উদাহরণ হচ্ছেন রাসেল স্বয়ং। রাসেল নিজে এমন একজন মুক্তচিন্তার মানুষ হয়েও তিনি বামপন্থার রাজনীতিতে বিশ্বাস রাখতেন না। আরেকজন উদাহরণ অবশ্যই আম্বেদকর। তিনিও বুদ্ধকে মার্ক্সের থেকে বেশি উপযোগী মনে করেছেন। তবে?

কোনো বিষয়ে র‍্যাডিকাল না হয়েও জীবনের একটা দর্শন তৈরি করা যায়। কোনো কিছুই সমাজে রাতারাতি আমূল পরিবর্তন করা যায় না। সব পরিবর্তন ধীরে ধীরে হয় আর সেটাই খাঁটি পরিবর্তন। কেউ ডগম্যাটিক হতে পারে, অর্থোডক্স হতে পারে, আবার স্কেপ্টিক হতে পারে, আস্তিক, নাস্তিক, অজ্ঞেয়বাদী যা হোক কিছু একটা হতেই পারে। কোনো অবস্থানই মানুষের চূড়ান্ত অবস্থান না। জীবন থেকে এই চূড়ান্ত শব্দটাকে বাদ না দিলে স্বাস্থ্যকর সমাজ বলে কিছু থাকবে না। আমাদের একজন বাঙালি লেখক ছিলেন, দুর্ভাগ্যবশত আজকাল তাঁকে খুব কম পড়েন মানুষ, তিনি হলেন পরশুরাম, অর্থাৎ রাজশেখর বসু। কী আশ্চর্যজনকভাবে তিনি ভারতের ডগম্যাটিজমের দিকে আঙুল দেখিয়েছেন আবার সঙ্গে সঙ্গে এই দেশেরই ভাবনায় যে অমূল্য কাব্য, দর্শনের ঐতিহ্য তারও কী অসামান্য মূল্যায়ন করে গেছেন প্রবন্ধে, অনুবাদে আজীবন। আমার খুব বলতে ইচ্ছা করে পারলে 'পরশুরামের গল্পসমগ্র' তরুণ প্রজন্মের হাতে তুলে দিন। ওতে অনেক চিন্তার রসদ আছে। এক বিরিঞ্চিবাবা শুধু না।

সমাজ নানা বোধের মানুষ নিয়ে। এই যেমন 'হনুমান অংশ' সিনেমাটা নিয়ে সারা দেশে খুব আলোচনা হচ্ছে। আমি দেখতে গেলাম। বেশ লাগল সিনেমাটা। পরিচালক ভীষণ সৎভাবে নিজের বিশ্বাসটা রেখেছেন। এখন আমি তর্ক করতেই পারি, উনি কি সত্যিই ট্রেন থামিয়ে দিয়েছিলেন? সত্যিই জিভের উপর গাছ গজিয়েছিলেন? এখন আমার কথা হচ্ছে এই তর্কে আমার যাওয়ার দরকার কী? আমি ট্রেন থামাতে পারি না, আমি জিভের উপর গাছ গজাতে পারি না, এই নিয়ে আমার কোনো সংশয় নেই। কিন্তু কেউ যদি বিশ্বাস করেন উনি করেছিলেন, আমি তাকে কেন বলতে যাব তুমি একটা মূর্খ? নিম করোলিবাবা-কে শ্রদ্ধা করেন, বিশ্বাস করেন এমন অনেক জ্ঞানীগুণী মানুষ আছেন। আমার কী দায় পড়েছে যে আমি আমার যুক্তিবোধকেই ধ্রুব জেনে তাকে আঘাত করব। এও এক ধরণের 'ডগম্যাটিজম্‌'। এখানে শ্রীরামকৃষ্ণের একটা চমৎকার সিদ্ধান্ত আছে। একদিন শ্রীরামকৃষ্ণের ওখানে পুনর্জন্ম নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তো মাষ্টারমশায় সারারাত ঘুমাতে পারেননি সেই আলোচনা শুনে এসে, কারণ উনি বিশ্বাস করতে পারছেন না। তো পরের দিন উনি ঠাকুরের কাছে গেছেন। ঠাকুর একাই পায়চারী করছেন। উনি খুব সঙ্কোচের সঙ্গে বললেন, দেখুন, আমি না ওই পুনর্জন্মবাদটা ঠিক বিশ্বাস করতে পারছি না, এতে কী আমার কিছু অপরাধ হবে? ঠাকুর হেসে বললেন, কেন অপরাধ হবে, তুমি শুধু জানবে হলেও হতে পারে, কিন্তু আমি ওটা বুঝি না।

মণি (কথামৃতকার) - আমার পূর্বজন্ম ও সংস্কার এ-সব তাতে তেমন বিশ্বাস নাই; এতে কি আমার ভক্তির কিছু হানি হবে?

শ্রীরামকৃষ্ণ - তাঁর সৃষ্টিতে সবই হতে পারে এই বিশ্বাস থাকলেই হল; আমি যা ভাবছি তাই সত্য; আর সকলের মত মিথ্যা; এরূপ ভাব আসতে দিও না। তারপর তিনিই বুঝিয়ে দিবেন। “তাঁর কাণ্ড মানুষে কি বুঝবে? অনন্ত কাণ্ড! তাই আমি ও-সব বুঝতে আদপে চেষ্টা করি না। শুনে রেখেছি তাঁর সৃষ্টিতে সবই হতে পারে। তাই ও-সব চিন্তা না করে কেবল তাঁরই চিন্তা করি। হনুমানকে জিজ্ঞাসা করেছিল, আজ কি তিথি, হনুমান বলেছিল, আমি তিথি নক্ষত্র জানি না, কেবল এক রাম চিন্তা করি। “তাঁর কাণ্ড কি কিছু বুঝা যায় গা! কাছে তিনি অথচ বোঝবার জো নাই, বলরাম কৃষ্ণকে ভগবান বলে জানতেন না।”

তাই বলে তর্ক থাকবে না? থাকবে। কিন্তু আক্রমণ থাকবে না। তীব্র তর্ক থাকতে পারে। সব কিছু নিয়ে প্রশ্ন করা যেতে পারে। সেটা স্বাস্থ্যকর। কিন্তু কোনো মানুষকে আক্রমণ করা অস্বাস্থ্যকর। তর্ক করা বৌদ্ধিক অধিকার, কিন্তু আক্রমণ করা, হেয় করা, এগুলো সামাজিক অনধিকার চর্চা। তর্ক করতে করতে, আলোচনা করতে করতে, লড়াই করতে করতে সমাজে পরিবর্তন আসে। সে পরিবর্তন ধীরে আসে।

মানুষ অবশেষে বুঝতে পারে, কোনো কিছু জানা মানেই জ্ঞান নয়। কোনো জানাই যে ধ্রুব জানা নয়, এই বোধটাই আসল জ্ঞান। নোমচোমস্কি-র মত নাস্তিক আর শ্রীরামকৃষ্ণের মত আস্তিক, আর সক্রেটিসের মত দার্শনিক তাই একই জায়গায় এসে দাঁড়ান, আমি জানি যে আমি কিছুই জানি না।

↑