Skip to main content

 

সেদিন সকাল থেকে বড় বেসুরো বাজছে মন। সব আছে, কিন্তু গতিটা নেই। ছুটির দিন। নিয়মমাফিক কাজে যে ভেসে যাব সে অবকাশও নেই। খবরের কাগজে চোখ বোলাতে বোলাতে কলিংবেল বাজল। উঠলাম। দরজায় দাঁড়িয়ে এমন একজন মানুষ যাকে দেখে আহ্লাদিত হওয়ার কিছু নেই। বহুকালের পুরোনো একটা সোয়েটার গায়ে, বয়েস পঞ্চাশ ছাড়িয়েছে। আমার পরিচিত, কিন্তু আমার পরিমণ্ডলের না। সুতরাং বিরক্ত হওয়ার সবটুকু অধিকারই মনের আছে। জিজ্ঞাসা করলাম, “বলুন।” হ্যাঁ, এইভাবেও জিজ্ঞাসা করা যায়। মানে আরকি “কী চাই?”

“বলুন” মানে, আপনাকে আমি জায়গা ছেড়ে দিচ্ছি। এখানে আমি সুপরিরিয়র। আমার চয়েস আছে আপনাকে চয়েস দেওয়ার। আপনার নেই। আমি বলতেই পারি আপনি এখন আসুন, আমি ব্যস্ত। চয়েস দেওয়ার মধ্যে আর অপারচুনিটি দেওয়ার মধ্যে সমাজ ভীষণ সুন্দর একটা খেলা সাজিয়ে দেয়। আমার অহংকে তৃপ্ত করে তুমি তোমার প্রয়োজন মিটিয়ে নাও।

কিন্তু এই আঁশটে খেলার বাইরে এই বাতাসে, এই আলোতে, এই মাটিতেই আরেক ক্ষেপার বাস। হৃদয়ের অন্তরালে তার পীঠ। সে মাঝে মাঝে আচমকাই নিজেকে জানান দেয়। মন বেহিসাবি হয়ে ওঠে। মনের একদিকে হৃদয়, আরেকদিকে বিষয়বুদ্ধি। কিন্তু এ টানাপোড়েনকে অনায়াসে কমিয়ে নেওয়া যায় হৃদয়কে গুরুত্ব না দিয়ে। হৃদয় সংসারে এলেবেলে, ওর হিসাব নেওয়ার জন্য সংসারে কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। ঈশ্বরকেও দেবালয়ে বন্দী করে সংসার থেকে দূরে রাখার ব্যবস্থা করা গেছে। সে ব্যাপারে আমরা হুঁশিয়ার।

কিন্তু এইবারে যে আমার হেরে যাওয়ার পালা। উনি একগাল হেসে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনাদের বাগানে ওইগাছটার চারা হলে আমাকে দেবেন? আমি রোজ ভাবি বলব, ভুলে যাই। দেবেন?”

আমি গাছটার দিকে তাকালাম। কী নাম ওর জানি না। ফুল হয়, কিন্তু কী ফুল সেও জানি না। আমি বললাম, বেশ তো।

উনি রাস্তায় গিয়ে বাইরের গেটটা লাগিয়ে, সাইকেলে উঠতে উঠতে বললেন, বড় ভালো হবে….. ফুলটা এত ভালো… বাহ বাহ…

চলে গেলেন।

এত টানাপোড়েনের সংসার আপনার, এমন অনিশ্চয়তার মধ্যে বাগান করবেন? গাছ লাগাবেন? গাছ লাগাবেন সেটা বড় কথা নয়, গাছ লাগিয়ে তাতে ফুল ফোটানোর ইচ্ছাটাই বড় কথা। এমন ইচ্ছা জন্মায় কী করে? তার মুখে দুশ্চিন্তা, আত্মম্ভরিতা, ঈর্ষাজাত আত্মকরুণার নুন দিয়ে দেন না? পিষে মেরে দেন না? স্বাভাবিক সুখকে হত্যা না করে কৃত্রিম সুখের অভাবের জন্য হাপিত্যেশ করার অধিকার জন্মায় না, এ কথা জানেন না? আর সেটুকু না করা গেলে বুদ্ধিজীবী মহলে কল্কে মেলে না, এ বোধটুকু নেই আপনার? কিন্তু তবু….. হেরে তো গেলাম।

এমন সহজ সরল একটা সুখ এত অভাব অনটনের মধ্যেও ওঁর হৃদয়ে জায়গা করে আছে দেখে অভিভূত হলাম। অভাব শব্দটা একটা সীমার পর এত কৃত্রিম, এত আপাত, অথচ এমন অমোঘ তার ঘের যে তার থেকে সচেতনভাবে মুক্তি পাওয়া দায়।

আমি আবার আমার ঘরে ফিরলাম। সব আগের মত আছেই, যেখানের জিনিস সেখানেই। শুধু আমার মনের অক্ষরেখা-দ্রাঘিমা রেখা বদলে গেছে। ঘরটা এখন অনেক বড়। বাইরে বাগানটা অনেক বড়। সময় ভীষণ শান্ত পায়ে এগোচ্ছে আমাকে হাতে ধরে। নিজের পিঠে নিজে চাবুক মারা বন্ধ। যদিও চাবুকের দাগগুলো লেগে। মুছে যাবে জানি। জানি না আবার কবে চাবুক হাতে নেব। আবার নিজের পিঠে নিজের “লড়াই” এর রক্তিম দাগ আঁকব।