Skip to main content

 

ফ্রিজের দরজাটা বন্ধ করতে গিয়ে কেতকীর বুকটা আবার ছ্যাঁৎ করে উঠল। ফ্রিজের উপরে পাপ্পুর ছবি। ক্লাস টু-তে পড়ে তখন। দীঘায় তোলা।

কেতকী জলের বোতলটা ভরে ফ্রিজে রেখে, ড্রয়িংরুমের আলোটা নিভিয়ে পাপ্পুর ঘরের সামনে দাঁড়ালো। আলোটা নেভানো। মানে শুয়ে পড়েছে। দরজাটা কি ভেতর থেকে লক্‌ করা? আজকাল কী যে স্বভাব হচ্ছে ওর। হালকা ঠেলা দিল। দরজাটা খোলা। একটা সুখ হল। জানলা দিয়ে ঘরে আলো এসে পড়েছে। পাপ্পু ঘুমাচ্ছে। ক্লাস টুয়লেভ্‌ হল। সদ্য পরীক্ষা শেষ হল। ঘুমাক। কিন্তু আলোটা? পর্দাটা টেনে দেবে? যদি বিরক্ত হয়? উঠে পড়ে? দরজাটা আবার ভেতর থেকে লক্‌ করে দেয়?

কেতকী দরজাটা টেনে নিজের শোয়ার ঘরে এসে ঢুকল। প্রশান্ত ঘুমিয়ে। নাক ডাকছে। হাফ প্যান্ট পরে খালি গায়ে ঘুমাচ্ছে চিৎ হয়ে। কী বিশাল পেট হয়েছে! সারা গা লোম। আজকাল প্রশান্তকে দেখলে ঘেন্না লাগে কেতকীর। রোজ অফিস যাচ্ছে আসছে, বাজার করছে, ক্লাবে যাচ্ছে। বিছানায় পড়েই ঘুমিয়ে যাচ্ছে। যদিও বা কোনোদিন কিছু হল তো ভীষণ যন্ত্রের মত।

কেতকী পাশে এসে শুলো। যতটা দূরে সরে শোয়া যায় ততটা দূরেই শুলো। আজকাল ঘুম আসতে চায় না। কারণটা জানে। কিন্তু বলবে কাকে? একা একাই কথা বলে যায়। ঘাম হয়। বুক ধড়ফড় করে। ভোর রাতে ঘুম যদিও বা আসে ক্লান্তিতে কাজের বউটার ঠেলায় সেও হয় না। সুগারটা বাড়ছে। এবারে ফাস্টিং এসেছে দুশো পনেরো।

কেতকী মোবাইলটা অন্‌ করল। পাপ্পু ছবির অ্যালবামটা বার করল। একটার পর একটা ছবি দেখে যাচ্ছে। মনটা ঘূর্ণির মত ঘুরে ঘুরে হাজার একটা দিকে আঙুল তুলে বলছে, কেতকী দেখেছিস? আজকাল তোর সামনে ল্যাংটো হয়ে প্যান্ট ছাড়তে চায় না, দেখেছিস? যে ছেলে এই ইলেভেন অবধি তোকে দেখলে সংকোচ করত না, আজকাল করে। দেখেছিস কেতকী দেখেছিস? কিন্তু সেটা তো কোনো বাচ্চাই করে না। তাও তো বাবু ক্লাস ইলেভেন অবধি করেছে। কিন্তু পাপ্পু আর অন্যরা এক হল? ওদের মায়েদের জীবন আর তোর জীবন এক কেতকী? এই ছেলেটা হাতের বাইরে চলে গেলে তোর জীবনের দাম কী থাকল আর? কী নিয়ে বাঁচবি? প্রশান্ত তো ফুরিয়ে গেছে…..

আবার উঠল কেতকী। গলাটা শুকিয়ে যাচ্ছে। ড্রয়িংরুমের দিকে যেতে যেতে আবার ছেলের ঘরের সামনে দাঁড়ালো। দরজাটায় ধীরে চাপ দিল। হালকা আওয়াজ হল। দরজাটা ফাঁক হল। ঘুমাচ্ছে।

দরজাটা ভেজিয়ে ড্রয়িংরুমে আলো জ্বালল। ফ্রিজ খুলল। জলের বোতল বার করে কয়েক ঢোক খেয়ে জলটা আবার পুরো ভরে ফ্রিজে ঢোকালো। ইতস্তত ঘুরল ঘরটায়। চেয়ারে বসল। উঠল। টয়লেটে গেল। টয়লেটের আলোটা জ্বালতেই কান্না পেল। কলটা চালিয়ে বসল। কাঁদতে কাঁদতেই নিজেকে পরিষ্কার করে উঠে দাঁড়ালো। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখল কিছুক্ষণ নিজেকে। কী আছে তার নিজের বলতে? কী? কিচ্ছু না। সব হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। সরমা বলছিল ডানকুনিতে এক পীরবাবা আছে। বশীকরণ জানে। ওর বরকে পেরেছে বাগে আনতে। পাপ্পুকে? আবার কান্না পেল।

টয়লেটের আলোটা নিভিয়ে, দরজাটা লাগিয়ে ফ্রিজের সামনে এসে দাঁড়ালো। পাপ্পুর ছবিটা দেখতে দেখতে ফ্রিজ থেকে জল বার করল। খেল। আবার জল ভরে রেখে ড্রয়িংরুমের আলোটা নিভিয়ে পাপ্পুর ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালো। দাঁড়াতেই সারা শরীর দিয়ে হিমেল স্রোত নেমে গেল। পাপ্পুর গলা। কথা বলছে। ঠিক নয়, নিজে না চাইতেও দরজাটায় চাপ দিল। ভিতর থেকে বন্ধ। মাথাটা ঘুরছে। গা গুলাচ্ছে। তাড়াতাড়ি বিছানায় গিয়ে শুলো।

======

পরেরদিন অমলেটে নুন দিল না, পেঁয়াজ দিল না। বলল পেঁয়াজ কাটার সময় নেই, নুন দিতে ভুলে গিয়েছিল। গীজারটা পাপ্পু স্নানে ঢোকার আগে চালিয়ে রাখল না। দুপুরে চিকেন ফ্রিজে থাকা সত্ত্বেও মাছের ঝোল করল। চা কড়া লিকার বানালো। শুধু পাপ্পুর ছাড়া জামাপ্যান্ট নিজেই কেচে ছাদে মেলে এলো। জামাপ্যান্টগুলো তো নিরীহ। ওদের কী দোষ। ওদের কেন নিজের কাছছাড়া করবে?

পাপ্পু আগের মত কথা বলে না। আজও সারাদিন তেমন কিছু বলল না। কানে হেডফোন নিয়ে কয়েকবার ছাদে গেল। বারবার ছাদের সিঁড়ির দিকে তাকালো। নামল কতক্ষণ পরে। এতটা!

তুই কিন্তু বড় বাড়াবাড়ি শুরু করেছিস...

পাপ্পু বলল, শুরু করলে আবার….

আবার মানে কী? আবার মানে কী?

আজ আবার কী করলাম?

কী করলাম মানে? কাল অত রাতে কার সঙ্গে কথা বলছিলি?

আশ্চর্য… আমার ঘরে সিসিটিভি লাগিয়েছ নাকি?

কার সঙ্গে?

পারমিতা… কেন?

অত রাতে? কোন ভদ্র বাড়ির মেয়ে….

আচ্ছা অভদ্র… তো?

তো মানে? আজকাল দেখছি মায়ের সঙ্গে দূরত্ব বাড়িয়েই যাচ্ছ…. বাড়িয়েই যাচ্ছ…. আজকাল মায়ের সামনে জামাপ্যান্ট বদলাতে পর্যন্ত বাধে… এই শোন…. তুই আজ নিজে স্নান করবি না…. সাবান-টাবান কী দিস…. আজ আমি স্নান করিয়ে দেব…..

আমার স্নান হয়ে গেছে…..

তো….. আমি হাতের কাজটা সেরে আসছি….. যা…..

ইচ্ছা করে কেতকী শোয়ার ঘরে চলে এলো। কিছু বলার সুযোগ দিল না ওকে। এসে হাঁপাতে লাগল। বুকটা ধড়াস ধড়াস করছে। একটু বসল। তারপর শ্যাম্পুর একটা নতুন প্যাকেট আর নতুন টাওয়েল নিয়ে বাথরুমের সামনে এলো। কিন্তু কোথায় সে? সারা ঘর নেই। বাইরে এসে দেখল পাপ্পুর কিটোটা আর সাইকেলটা নেই।

মাথাটায় মনে হল জ্বলন্ত কয়লা ঢেলে দিল কেউ। এত অকৃতজ্ঞ হয় কী করে মানুষ? যেমন বাবা, তেমনই ছেলে। মিনিমাম কৃতজ্ঞতাটা নেই। তিনবার ফোন করার পর ধরল।

কীরে কোথায় গেলি?

নিজের গলা শুনে আশ্চর্য হল কেতকী। এত নরম? এত কোমল? কেন?

এই তো পলাশের বাড়ি….. ওর মা এখানে খেতে বলেছিল…. ভুলে গিয়েছিলাম….. আসতে মনে পড়ল…. ওর বোনের আজ জন্মদিন…..

আমি যে বললাম তোকে স্নান….

আরে পাগল নাকি তুমি….. ছাড়ো তো…..

কেতকী ফোন রেখে দিল। ড্রয়িংরুমে পাখাটা ফুল স্পিডে চালিয়ে বসল। বসেই থাকল। সারাটা দুপুর। হাতে টাওয়েল আর শ্যাম্পুর প্যাকেটটা। সন্ধ্যে হল। কলিংবেল বাজল। প্রশান্ত এলো।

সেকি, আলো জ্বালোনি? মাইগ্রেনটা?

হ্যাঁ…. বোসো… চা আনছি…..

======

রাত একটা। পাপ্পু ফিরেছে সাড়ে আটটার। প্রশান্ত বলল, এই বয়েস, এটাই স্বাভাবিক। যেন ওর নিজের ছেলেই নয়।

দুটো। চারবার ড্রয়িংরুম, টয়লেট ঘোরা হয়ে গেছে। পাপ্পুর ঘরে আলো জ্বলছে। ফোনে কথা বলছে।

সাড়ে চারটে। পাপ্পু ঘুমিয়েছে। দরজাটা বন্ধ। প্রশান্ত ঘুমাচ্ছে। কেতকী গুনতে পারে না কতবার ড্রয়িংরুম, টয়লেট আর শোয়ার ঘরে এলো। কতবার জল খেল আর জল ভরল। একদিন এইভাবেই এই ঘরে কোথাও মরে পড়ে থাকবে।

ভোর ছ'টা। কলিংবেল বাজল। কাজের বউটা এলো। বৌদি চোখ এত লাল? মুখটা শুকনো…. কাঁদছ কেন…. বৌদি… বৌদি…. চা খাবে….. তুমি বসো…… মাথাটা আবার ধরেছে…. দাদাবাবুকে বলেছ…. দাদাভাইকে…. ব্যস্ত? ওরা তো সব সময়েই ব্যস্ত…. এই যে আমার ছেলেটা চারদিন হল সুন্দরবন গিয়ে বসে আছে…. না একটা ফোন…. না একটা কিছু…. মরুক গে….. আদা দেব?..... ভয়? কিসের ভয়? ছেলেকে নিয়ে?.... বৌদি…. তুমিও যেমন…. আমরা এখন ভাঙা ডিমের খোসা….. বমি পাচ্ছে? দাঁড়াও…. দাঁড়াও…. আমি আসি……