Skip to main content

 

003.jpg

 

দিনে গরম লাগলেও রাতের দিকে ঠাণ্ডা পড়ছে। তাই জানলা বন্ধ করেই শুতে হচ্ছে। বুকুর শুতে দেরিই হয়েছে আজ। হোমওয়ার্ক ছিল অনেক। ঘুম প্রায় এসেই গিয়েছিল, হঠাৎ শোনে ঠক্‌ ঠক্‌ শব্দ জানলায়। বুকু খাটে উঠে বসল। দেখে একটা ছোট্ট পাখি জানলায় ঠোকরাচ্ছে। বুকু তাড়াতাড়ি উঠে জানলাটার কাছে হাতের ইশারায় বলল, সরে যা, আমি জানলাটা খুলছি। পাখিটা উড়ে গিয়ে সামনের জবাগাছের ডালে বসল। বুকু জানলাটা খুলতেই উড়ে এসে বুকুর পড়ার টেবিলে বসল। বলল, তোমায় রাতে ঘুম থেকে তুললাম কিছু মনে কোরো না প্লিজ। তুমি দাঁড়িয়ে থেকো না। বসো, আমি বলছি।

বুকু বসল খাটের কোণায় পা ঝুলিয়ে। পাখিটা এসে খাটে রাখা জলের বোতলের উপর বসল। বলল, আমি ওই পুব দিকে রেললাইনের ধারে যে নারকেল গাছটা আছে, ওখানেই থাকি। কিন্তু কী হয়েছে জানো। গাছটা ওরা কাটবে কাল। এদিকে ওইগাছেই আমার তিনটে ডিম আছে। আর দু'দিনের মধ্যেই ওগুলো ফুটে বাচ্চা বেরোবে। কী করি বলো? এর মধ্যে তো বাসা বানিয়ে ফেলতে পারবো না, তাই বলছিলাম কি, তুমি তোমার বাড়ির কোথাও আমাকে একটু থাকতে দেবে? ডিমগুলো ফুটে, বাচ্চাগুলো একটু বড় হলেই আমি ওদের নিয়ে চলে যাব।

বুকু দাঁড়িয়ে পড়ল। বেশ উৎকণ্ঠার সঙ্গে জিজ্ঞাসা করল, ডিমগুলো কোথায় রেখে এসেছো?

পাখিটা উড়ে আবার টেবিলে বসে বলল, একটা প্লাস্টিকের ব্যাগে করে নিয়ে এসে ওই জবাগাছের ডালের সঙ্গে ঝুলিয়ে রেখেছি। আনবো ওদের?

বুকু বলল, এক্ষুনি নিয়ে এসো।

পাখিটা ফুরুত করে উড়ে গেল।

=======

ডিমগুলো বুকু একটা রুমালে করে জড়িয়ে খাটের কোনায় রেখেছে। তারপর দু'জনে মিলে একটা ঠিকঠাক জায়গা খুঁজতে শুরু করল। ঠাকুরঘরের ডানদিকে একটা তাকের উপর একটা পুরনো বেতের ঝুড়ি আছে। বেশি বড় না। ছোট। পাখিটা বলল, তুমি এইখানে একটা বিছানা করে দেবে, তবে এইখানেই থেকে যাই আমি।

বুকুরও জায়গাটা বেশ পছন্দ হল। সে বলল, বেশ। তুমি ডিমগুলোর কাছে বসো, আমি বিছানা করে দিচ্ছি।

পাখিটা উড়ে ডিমগুলোর কাছে গিয়ে বসল। বুকু কয়েকটা রুমাল ভাঁজ করে করে ঝুড়িটার মধ্যে সুন্দর বিছানা করল। তারপর ঘরে গিয়ে বলল, তুমি যাও আমি ডিমগুলো নিয়ে যাচ্ছি। পাখিটা উড়ে গিয়ে বসলো, আর বুকু ডিমগুলো খুব সাবধানে যত্ন করে নিয়ে গিয়ে ঝুড়ির মধ্যে রাখল। পাখিটা ডিমগুলোর উপর বসে তা দিতে শুরু করল। আর বুকুকে বলল, যাও তুমি শুয়ে পড়ো। অনেক রাত হল। বুকু দেখল, সত্যিই রাত হল। প্রায় তিনটে বাজতে চলল।

=======

পরের দিন সকালে একটু বেলায় উঠলো। বাড়ির সবাইকে পাখির ঘটনাটা বলল। বাড়ির সবাই যখন উঁকি মেরে ঝুড়িটা দেখল, তখন শুধু তিনটি ডিমই আছে। পাখিটা নেই। বুকু বললো, ওর তো কাজ আছে বলো। সে সব সেরে নিশ্চয়ই চলে আসবে বেলায়।

তাই হলো। বিকেল গড়াতে গড়াতেই পাখিটা চলে এলো। বুকু তখন কম্পিউটারে বসে একটা প্রজেক্ট করছিল। পাখিটা বলল, আমি একটু তা দিয়ে নিই। তুমিও তোমার কাজ সেরে নাও। তারপর আমরা একটু গল্প করবো। বুকু মাথা নেড়ে বলল, আচ্ছা।

বুকু সন্ধ্যেবেলা একবার দেখল, পাখিটা তা দিতে দিতে ঘুমিয়ে পড়েছে। আহা! সারাদিন কত কাজ করে পাখিটা। নিশ্চয়ই ভীষণ ক্লান্ত হয়ে গেছে উড়ে উড়ে। বুকু মনে মনে বলল, ঘুমা।

বুকু রাতের খাবার পর যখন শুতে আসলো, দেখে, পাখিটা তার টেবিলের উপর বসে আছে। বুকু ঢুকতেই বলল, তুমি খুব ভালো বুকু। নইলে কী বিপদে পড়তাম বলতো আমি। গাছটা ওরা কেন কাটছে জানিনা। শুনলাম ওখান থেকে নাকি একটা ব্রিজ বানাবে। মানুষ এত কম আমাদের কথা ভাবে বুকু।

বুকু বলল, মন খারাপ করো না। তুমি বাচ্চাগুলোর কিছু নাম ভেবেছো? পাখি বলল, না তো। তুমি বরং ওদের নাম রেখো। বুকু এক গাল হেসে বলল, দারুন হবে! আমি নাম রাখবো।

এরপর বুকু আর পাখিটা বেশ কিছুক্ষণ গল্প করল। তারপর বুকু বলল, আমি শুতে যাই বুঝলে, কাল তো ভোরে স্কুল। তুমিও যাও বিশ্রাম করো গিয়ে।

পাখিটা 'গুড নাইট' বলে, চলে গেল। গিয়ে আবার ঝুড়িটার ভেতর বসলো।

=======

কয়েকদিন পর বুকু স্কুল থেকে ফিরতেই মা বলল, তাড়াতাড়ি হাত-মুখ ধুয়ে আয় বুকু, দেখ গিয়ে কী সুন্দর তিনটে ফুটফুটে বাচ্চা হয়েছে!

বুকু লাফ দিয়ে নেচে উঠে বলল, তাই!! এই বলে সে ব্যাগটা সোফায় রেখে দৌড়ে ঝুড়িটার কাছে গেল। গিয়ে দেখে তিনটে ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চা ঠোঁট উঁচু করে 'চিঁচিঁ' করে ডাকছে। বুকু তো ভীষণ খুশি হয়ে গেল। হাততালি দিয়ে দিয়ে নাচতে শুরু করলে। তার মা ভাত মেখে এনে বুকুকে খাইয়ে দিতে লাগলো, আর বুকু বাচ্চাগুলোর সঙ্গে গল্প করে যেতে লাগলো। ওরা কিচ্ছু বুঝছে না। খালি ডেকে যাচ্ছে।

দেখতে দেখতে ওদের মা এলো। মুখে করে কী সব এনেছে। এসেই বাচ্চাগুলোর মুখে একটু একটু দিতে লাগলো। সব খাবারগুলো দিয়ে বুকুর দিকে ফিরে বলল, মনে আছে তো নাম দেওয়ার কথা। এবার কিন্তু তোমার নাম দেওয়ার পালা। বুকু বললো, আমি খাওয়াবো ওদের। পাখি বলল, নিশ্চয়ই খাওয়াবে। বুকুর মা বলল, কী বায়না হচ্ছে বুকু। ওর মা ওকে খাওয়াবে। তুমি কী সব খাওয়াবে আর ওরা অসুস্থ হয়ে যাবে।

পাখি বুকুর মায়ের কথা বুঝলো না। সে জিজ্ঞাসা করল, মা কী বলছেন বুকু? বুকু বললো তার মা কী বলছে। পাখি শুনে বলল, মা'কে বলো সে ব্যবস্থা আমি করে নেব। উনি যেন ভয় না পান। বুক খুশি হয়ে সেই কথা তার মাকে বলল। বুকুর মা বলল, আচ্ছা বেশ।

এরপর পাখি বুকুদের রান্নাঘরে গিয়ে এইটা ওইটা দেখাতে লাগলো, বুকু সেগুলো একটু একটু করে এনে বাচ্চাগুলোকে খাওয়াতে লাগলো। যেমন ছোট্ট একটু ফলের অংশ; একটুখানি আটার দলা; বিস্কুটের গুঁড়ো... এইসব।

বুকুর এখন স্কুলে যেতে ইচ্ছা করে না। খালি মনে হয় বাচ্চাগুলোকে দেখি। বাচ্চাগুলোর সঙ্গে খেলি। কিন্তু স্কুলে তো যেতেই হবে। পরীক্ষা চলছে যে।

একদিন বুকু টেবিলে বসে অংক করছে, কাল অংক পরীক্ষা যে। আর পাখিটা তার বাচ্চাগুলোর সঙ্গে খেলছে। হঠাৎ বুকু'র মনে পড়ল, আরে সামনের আট তারিখ তার জন্মদিন যে! সে তাড়াতাড়ি উঠে পাখিটার কাছে গিয়ে বলল, এই জানো, সামনের আট তারিখ আমার জন্মদিন। তোমরা থাকবে কী যে মজা হবে।

পাখিটা শুনে একটু চিন্তিত হল। বলল, বুকু, অতদিন তো আমার মনে হচ্ছে না থাকা যাবে। বাচ্চাগুলোকে নিয়ে একটা বাসা তো বানাতে হবে বলো? নইলে বর্ষায় খুব কষ্ট হবে। আর বাচ্চাগুলোকে যদি এখানে রাখি, তবে ওরা আমাদের জীবনযাত্রা শিখবে না। পাখি তো ঘরের মধ্যে থাকার জন্য নয় বলো। ওদের উড়তে শিখতে হবে, ঝড়-জল-রোদ এগুলোর সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে। খাবার খাওয়া শিখতে হবে নিজে নিজে। এগুলো তো এখানে থাকলে হবে না। আর আমাদের জানো তো এখন শেখাতে না পারলে আর কোনদিন শেখাতে পারবো না। ওরা পঙ্গু হয়ে যাবে। তারপর বেড়ালে, সাপে খেয়ে নেবে।

বুকুর মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। বুকু জানে পাখিটা যা বলছে সব ঠিক। সে যদি জোর করে রাখে তবে খুব বাজে হবে। তার চোখে জল চলে এলো। সে তাড়াতাড়ি পড়ার ঘরে গিয়ে খাতা-পেন নিয়ে বসল। পাখিটা বুঝতে পেরেছে। সে তার কাঁধে বসে বলল, মন খারাপ করো না বুকু। আমাকে দু'দিনের মধ্যেই যেতে হবে ওদের নিয়ে। আমি ইতিমধ্যে একটা বাসা বুনতে শুরু করেছি। তোমার স্কুলে যাওয়ার রাস্তাতেই গাছটা আছে। একটা বড় আমগাছ। আমি দেখিয়ে দেবো তোমায়। আর তোমার জন্মদিন তো দেরি আছে। ততদিনের একটু উড়তেও শিখে যাবে। আমি ওদের নিয়ে অবশ্যই আসব। তুমি একদম মন খারাপ করবে না।

বুকুর মন খারাপটা তাও যাচ্ছে না। সে তবু হাসার চেষ্টা করে বলল, বেশ।

=======

চারদিন হল পাখিটা ওর বাচ্চাদের নিয়ে উড়ে গেছে। বুকুর মনটা খুব খারাপ থাকে। সে ওই ঝুড়িটা ওরকমই রেখে দিয়েছে। কয়েকটা পালক খুব সাবধানে যত্নে রেখেছে। স্কুল থেকে ফিরে ফাঁকা ঝুড়িটা নিয়ে ছাদে যায়। একা একা বসে থাকে। সন্ধ্যে হওয়ার আগে নেমে আসে। ঝুড়িটা জায়গায় রেখে পড়তে বসে। বারবার ঝুড়িটার দিকে চোখ যায়। মনে হয় এক্ষুনি পাখিটা উড়ে আসবে। এক্ষুনি বাচ্চাগুলোর গলার আওয়াজ শুনবে। সে ওদের নামও রেখেছে --- লাল, নীল আর সবুজ।

দেখতে দেখতে বুকু'র জন্মদিন এলো। কিন্তু সেদিন সকাল থেকে যেমনি ঝড়, তেমনি বৃষ্টি। বুকুর মন ভীষণ খারাপ। সে এখন জানে কোন আমগাছে ওরা থাকে। ওখান থেকে উড়ে আসা এই অবস্থায় কি সম্ভব? বুকুর মনের অবস্থা বাড়ির সবাই বুঝতে পারছে। তারা বলছে দেখ না বেলায় হয়তো বৃষ্টি ধরে যাবে। পাখি ঠিক আসবে।

কিন্তু বৃষ্টি কমার তো নামই নেই। উল্টে আরো বেড়ে যাচ্ছে।

বুকু জানলাটার কাছে বসে। কালো মেঘে অন্ধকার চারিদিক। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। বাজ পড়ছে। সামনের বাড়ির টিনের চালের উপরে ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছে। কিরকম একটা আওয়াজ হচ্ছে। আগে এই আওয়াজটা শুনলে কি ভালো লাগতো। এখন ভালো লাগছে না। বকু চাইছিল ওরা আসলে একসঙ্গে কেক কাটবে। কিন্তু কী করে আসবে। সন্ধ্যেবেলায় বুকুর সব বন্ধুরা আসবে। পাখিটা আর আসতে পারবে না। অন্ধকারে বাচ্চাগুলো নিয়ে ওড়ে নাকি?

বিকেলবেলায় সত্যিই ঝড়-বৃষ্টি থেমে গেল। পাখিটা তার বাচ্চাগুলোকে নিয়ে এল। আরো কত বন্ধুরা আসলো বুকুর। সারা সন্ধ্যে খুব মজা হলো। বাচ্চা পাখিগুলোর সঙ্গেও বুকুর দারুন বন্ধুত্ব হল। বুকু লাল, নীল, সবুজ ডাকলেই ওরা সাড়া দিচ্ছিল। খুব হই হই হল। খাওয়া দাওয়া হল। তারপর যে যার বাড়ি চলে গেল।

আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বুকু জানলার ধারে দাঁড়িয়ে। কত কত পশুপাখি এই বৃষ্টির মধ্যে কিভাবে আছে! ওদের কে শেখালো নিজেকে কী করে বাঁচিয়ে রাখতে হয় এই দুর্যোগে? সত্যি যদি সেদিন সে জেদ করতো, ওদের না যেতে দিত তবে খুবই ক্ষতি হতো। বুকু শুয়ে পড়লো। কিন্তু ঘুম আসছে না। একটু দুশ্চিন্তা হচ্ছে। ঝড় যদি বাড়ে? যদি ওদের বাসা ভেঙে যায়! উঠে বসে পড়ল বুকু। জানলার কাছে এসে দাঁড়ালো। জানলা খুলে বললো, যদি মনে হচ্ছে কোন বিপদ হবে তবে চলে আসবি, আমি অপেক্ষা করবো।

বুকু জানে এই কথাটা বাতাস পাখিগুলোকে পৌঁছে দেবে। মা বলে, কেউ কাউকে নিয়ে ভাবলে সে যত দূরেই থাকুক সে বুঝতে পারে। পাখিটাও নিশ্চয়ই বুঝবে।

(ছবি Suman Das)