এ ঘটনাটা না লিখলেও হত। কিন্তু নারী দিবসের এই শেষ লগ্নে এসে মনে হল লিখে রাখলেই বা ক্ষতি কী?
একটা দোকানে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছি। বেশ ভিড় চারদিকে। একটা ছেলে এল কাল প্যান্ট আর কালো টিশার্ট পরা। স্কুটিটা স্ট্যান্ড করিয়ে দাঁড়াল। ঘড়ি দেখল কয়েকবার। তার ছিপছিপে শরীরে কী যেন চঞ্চলতা। চুলগুলো ঘাড় এসে ছুঁয়েছে। সেগুলোকে একটা গার্ডারে বেঁধে শাসন করে রাখা। একটু পরে একটা বাইক এসে দাঁড়ালো। সাদা টিশার্ট আর জিন্স পরা একটা ছেলে নামল। দেখে মনে হল সমবয়সী।
আগের জন বলল, দেরি হল এত?
বাবার শরীরটা ভালো না…..চায়ের অর্ডার দিয়েছিস?
দুই ভাঁড় চা এলো। এবার ওরা নির্জনতা খুঁজছে বুঝলাম। কথা বলতে বলতে চারপাশ তাকাচ্ছে। সতর্ক চোখ। যেন মেঝেতে ছড়ানো চাল খুঁটে খাচ্ছে দুটো পায়রা, খেতে খেতে বারবার এদিক ওদিক তাকানো, নইলে কে কখন কার শিকার হয়ে যায় বলা তো যায় না।
সাদা টিশার্ট বলল, তাড়াতাড়ি শেষ কর না চা’'টা। প্রথমজন বলল, দাঁড়া বাবা, গরম তো!
দ্বিতীয়জন আরো কয়েকবার তাড়া দিল। কিন্তু গরম চা তো। শেষে অধৈর্য হয়ে সে প্রথম জনের হাত থেকে চায়ের ভাঁড়টা নিয়ে একটু দূরে গিয়ে ফেলে দিয়ে এলো। সে ফিরে আসতে প্রথমজন বলল, পাগল একটা!
এবার দ্বিতীয়জন তার অর্ধেক খাওয়া চায়ের ভাঁড়টা তার দিকে এগিয়ে বলল, খা।
প্রথমজন সলজ্জ তাকালো চারদিকে। নিল ভাঁড়টা। মিথ্যা বলব না, আমার সঙ্গে ওদের কয়েকবার চোখাচোখি হয়েছে। আমি চোখ সরিয়েছি। ওরা বুঝেছে।
এতক্ষণ খেয়াল করিনি রাস্তার উল্টোদিকে কয়েকটা ভ্যান এসে দাঁড়িয়েছে। তাতে রংবেরঙের আলো লাগানো কী সব। ওগুলোকে কী বলে আমি জানি না। বিসর্জনের সময়, বর বিয়ে করতে যাওয়ার সময় ওগুলো আগে পিছে যায় দেখেছি। সেগুলোতে আলো জ্বলে উঠল। বরের সাজানো গাড়ি এসে দাঁড়ালো। বরযাত্রীরা আসতে লাগল। বেশ কিছুটা দূরে একটা বাস দাঁড়িয়ে। বরযাত্রীরা হইহই করতে করতে সেদিকে ছুটছে। কত সাজ। ব্যাণ্ডপার্টি বাজনা বাজাতে শুরু করল, ওম জয় জগদীশ হরে। এটা রীতি দেখেছি। আগে একটা ঠাকুরের গান বাজায়। অনেকেই নাচতে শুরু করল। চায়ের দোকানে সবাই উজ্জ্বল পোশাকের মানুষজন দেখছে। দ্বিতীয়জন প্রথমজনের হাতটা শক্ত করে নিজের হাতের মুঠোয় ভরে দেখছে। প্রথমজনের হাতে দ্বিতীয়জনের শূন্য চায়ের ভাঁড়। দুজনেই তন্ময়।
বিয়ে বাড়ির লোকজন চলে গেল। জায়গাটা হঠাৎ অন্ধকার হয়ে গেল যেন। প্রথমজন দ্বিতীয়জনের কানে কিছু একটা বলল। দ্বিতীয়জন হাসল। প্রথমজন তার হাতটা ছাড়িয়ে বলল, যাই….দ্বিতীয়জন বলল, না। ওদিকে চল, কথা আছে।
দ্বিতীয়জন চায়ের দাম মেটাতে গেল। প্রথমজন শূন্য দৃষ্টিতে রাস্তার দিকে তাকিয়ে। রাস্তায় কিছু ফুল পড়ে। বিয়ের সাজের ফুল। টাটকা এখনও।
মানুষ যদি নিজেকে সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করতে না পারে, সে মরে বেঁচে থাকে। একই আকাশে সবার আলাদা আকাশ। গুবরে পোকার আকাশ আর দোয়েলের আকাশ এক বুঝি? একের পরিধিতে আরেকজন বাঁচে? সমাজ ছকভাঙা অঙ্ক ভয় পায়। কিন্তু হৃদয় পায় না। দ্বিতীয়জন গাড়িটার স্ট্যাণ্ড তুলতে তুলতে বলল রাতে বিরিয়ানি খাবি? আমি খাওয়াব… যাবি?
প্রথমজন গাড়িতে উঠে স্টার্ট দিয়ে বলল, টাকাগুলো বিয়ের জন্য জমা…. তোর বউয়ের লাগবে…..
একরাশ ধবধবে কান্না ছুঁড়ে দিল অভিমানী কণ্ঠ ফাল্গুনের বাতাসে। দুটো গাড়ি মিলিয়ে গেল অন্ধকার। কিন্তু এ গল্পটা? জানি না।