Skip to main content

 

স্নানের পর ভিজে গায়ে বসে অনন্ত। তার কুম্ভে যাওয়ার কথা ছিল। ছুটি পেল না। যাওয়া হল না। দিদি গিয়েছিল। সঙ্গে জামাইবাবু আর মেয়েটা। দিদি নেই। পদপিষ্ট হয়ে মারা গেছে। গতকাল খবর পেয়েছে। ওরা কানপুরে থাকে। অনন্ত হুগলির ত্রিবেণীতে থাকে। জন্ম ভাগলপুরে। কাজের সূত্রে এখানে।

অনন্তর গা মাঘের বাতাসে শুকিয়ে গেল। পাশেই শ্মশান। খুব জোর নামসংকীর্তন হচ্ছে। কেউ এলো। নিয়ে আসা হল। যেদিন জন্মায় মানুষ, সেদিন কেউ কোল পাতে। যেদিন যায়, সেদিন কেউ কাঁধ দেয়। কী আশ্চর্য বিধান!

কাল থেকে কিছু খায়নি অনন্ত। গলা দিয়ে নামছে না। দিদি তার থেকে বারো বছরের বড় ছিল। দিদি ভালো গান গাইতে পারত। কাপড় সেলাই করতে পারত। অনন্ত কথা বলতে পারে না। ভারী মাল তুলতে পারে। দিদির চাইতে বেশি ভাত খেতে পারে। মারও।

কথায় বলে বোবার শত্রু হয় না। কেউ বলে না, বোবার বন্ধুও হয় না। অনন্তের বন্ধু নেই, মালিক আছে। সুখ নেই, জীবন আছে।

গতকাল কেঁদেছে। সারারাত কেঁদেছে। দুটো চোখ জ্বালাজ্বালা করছে। সর্দি লেগেছে মনে হচ্ছে। ওরা ফোন করে বলল, তোমার দিদি কুম্ভে চাপা পড়ে মরে গেছে….. আর কিছু না বলেনি। জানে তো অনন্ত কথা বলতে পারে না। ফোন রেখে দিয়েছে। অনন্ত কাজে ছিল। কাউকে কিছু না বলে বাকি দিনের কাজটা করে বাড়িতে ফিরে এসেছে। কী বলত? কাকে বলত? কী ভাষায় বোঝাত? তবে সারাদিন কাল ক্লান্তি লাগেনি। এটাই আশ্চর্য।

ত্রিবেণীর শ্মশানের পাশে বাঁচতে বাঁচতে যৌবনের শেষ অধ্যায়ে চলে এল অনন্ত। জীবনটা বড় ক্ষণস্থায়ী। গোটা পৃথিবী জুড়ে নিরবচ্ছিন্ন মৃত্যুলীলা চলছে। সেদিকে তাকায় না মানুষ। ভীতু মানুষ সেদিকে আড়াল করে ভাবে অনন্তকাল বেঁচে থাকবে সে। তার ভালোবাসার মানুষেরাও সবাই বেঁচে থাকবে। অবোধ মন জ্ঞানীর ভান করে জীবন কাটায়।

জনার্দন পণ্ডিত গঙ্গাস্নান করে, বেণীমাধব শিবের মন্দিরে প্রণাম করে গীতা পড়তে বসতেন। বড় ভালো মানুষ ছিলেন। অনন্তকে স্নেহ করতেন। অনন্তর মনে হত সে যেন তার মরে যাওয়া বাবার ভাই। তার আত্মীয়। অনন্ত কোনো কোনোদিন গীতাপাঠ শুনেছে। আশ্চর্য লেগেছে বিশ্বরূপ দর্শনের বর্ণনা শুনে। এই ত্রিবেণী শ্মশানের পাশে কত রাত শুয়ে কাটিয়ে দিয়েছে গঙ্গার ধারে। বিশেষ করে গরমকালে। গভীর রাতে মাঝে মাঝেই “বলো হরি, হরিবোল”.... কিম্বা “রামনাম সত্য হ্যায়”... শুনতে শুনতে, তারায় ভরা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে হয়েছে সে যেন বিশ্বরূপ দেখছে ভগবানের। জগতজুড়ে মৃত্যুলীলা চলছে। সবাই যাবে সেই বিশাল কালের মুখের মধ্যে, অন্ধকারে। কিন্তু সবাই ভাবে সেদিন অনেক দূরে…. আপাতত যা আছে থাক না….. গোটা জীবনের সব সুখ এই “আপাতত” শব্দের উপর দাঁড়িয়ে। হা মাধব! হা গোবিন্দ!

উঠল অনন্ত। চায়ের দোকানে ঘড়িটা দেখল। কাজে গেলেই হয়, এখনও সময় আছে। আধশুকনো গামছাটা কোমরে জড়িয়ে চায়ের দোকানে এসে দাঁড়ালো। এক ভাঁড় চা এগিয়ে দিতে দিতে বাপি জিজ্ঞাসা করল, চোখদুটো অমন লাল কেন তোর? নেশাটেশা তো করিস না….

বাপির ছেলেটা এই গঙ্গাতেই ডুবেছে। অতবড় ছেলে। মৃগী ছিল। তাও নেমেছিল জলে। সেদিন দোল ছিল। বাপির সেদিনের কান্নায় ভেঙে পড়া মুখটা মনে পড়ল অনন্তের। তার চোখ ফেটে জল এল। সেদিনের কান্নার মানে যেন আজ বুঝল অনন্ত। কাল থেকে যে কান্না একা চার দেওয়ালের মধ্যে ছিল, আজ এই রাস্তায় চায়ের দোকানে সামনে উপচে পড়ল। বাপি হাঁ করে অনন্তের দিকে তাকিয়ে। অনন্ত ততক্ষণে উবু হয়ে রাস্তায় বসে পড়েছে। মুখ দিয়ে এমন সব শব্দ বেরোচ্ছে যা মানুষের প্রচলিত বর্ণমালায় আসে না। সে বোঝাচ্ছে তার দিদির কথা। চলে যাওয়ার কথা। বাপি তার মাথায় পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে বলছে শান্ত হ…. শান্ত হ….

এ কান্নার সুর জানে বাপি। তার বুকের মধ্যে জলে ডোবা মৃত ছেলে ডেকে উঠছে…..”বাবা…বাবা”..... বাপি দেখছে অনন্তের পাশে বসে….. লক্ষ লক্ষ বছর ধরে মানুষ মহাকালের তীরে কুম্ভস্নানে নামছে….কেউ মরছে…কেউ অমৃত পান করছে…কেউ হারিয়ে যাচ্ছে….. স্তবগানের স্বর ঠেলে কখনও কান্নার রোল উঠছে…. কখনও স্তোত্রের সুরে সব শান্ত হচ্ছে…… মৃত্যু ছাড়া জীবনকে এত কাছ থেকে কে চেনায়?