Skip to main content

 

উপনিষদ কেউ পড়ে থাকুন, কী না পড়ে থাকুন, তার একটা কথা অনেকেই শুনেছেন, “সত্যমেব জয়তে”। সত্যের জয় হয়ে থাকে। কথাটা আমাদের রোজকারের ভাষায় সরল করে বললে দাঁড়ায়, সত্যিটা সবাই একদিন না একদিন জানতেই পারেন। কবে কখন কীভাবে জানতে পারে তার স্পষ্ট উত্তর নেই, সে আদি অনন্তকাল রহস্যাবৃতই থেকে যাবে।

ভ্রান্তিটা মানুষের নিজস্ব সৃষ্টি। তার তুমুল ব্যাখ্যা বহু দার্শনিক করেছেন। কান্ট তাদের মধ্যে প্রধান একজন। এ ছাড়াও ভ্রান্তির তত্ত্ব এখন দর্শনের আঙিনা ছেড়ে বিজ্ঞানের আঙিনাতেও এসে পড়েছে। মানুষ কীভাবে নিজের সৃষ্ট ভ্রান্তিতে নিজেই নাজেহাল, নাস্তানাবুদ হচ্ছে সে নিয়ে ড্যানিয়েল সাহেবের ‘ফাস্ট এণ্ড স্লো থিংকিং’, ‘’নয়েজ’ ইত্যাদি বই উদাহরণ।

ভ্রান্তি আছে। কিন্তু তার থেকে মুক্তির কোনো বড় রাস্তা নেই। ভ্রান্তির শক্তি মোহের শক্তি। সে ছোটোকে বড় করে দেখায়, বড়কে তুচ্ছ করে দেখায়, অসংগতির মধ্যে সংগতির ভাণ তৈরি করে, দুর্বৃত্তকে মহাত্মা, আর মহাত্মাকে ভণ্ড প্রতিপন্ন করে, আবশ্যককে অনাবাশ্যক আর অনাবশ্যককে অপরিহার্য দেখাতে পারে। মোট কথা সত্যের যে মর্যাদাবোধ আছে, সীমারেখা আছে, যার উপর এ সৃষ্টির ভারসাম্য সামঞ্জস্য টিকে আছে ভ্রান্তির শক্তিতে তা বিপন্ন হবেই। কারণ ভ্রান্তি আবরণী শক্তি আর ভয় বিক্ষেপকারী শক্তি। এ আমাদের পূর্বতন দার্শনিকেরা বলেন। ভ্রান্তি সরল স্বচ্ছ দৃষ্টিকে আচ্ছাদিত করে। ভীতি তাকে বিক্ষিপ্ত করে। একে অন্যের সঙ্গে ওতোপ্রোতো জড়িয়ে। তাই ভ্রান্তিজাত মোহের শক্তি যেখানে থাকে সেখানে ভয় বা দুঃসাহস কোনো একটা থাকবেই। একই জিনিসের দুই রূপ ওরা।

কিন্তু এ সব কিছুর পরেও আশার কথা হল, সত্যের প্রকাশ হবেই।

কিন্তু সত্য মানেই কি মঙ্গল, শুভ?

ভারতীয় আস্তিকবাদের দর্শনে, শুভ। পাশ্চাত্য দর্শনে এর কোনো উত্তর নেই স্পষ্ট। ভারতীয় দর্শনে সত্যের আরেক অর্থ শুভ, কারণ তার অস্তিবাদের প্রাণকেন্দ্র যে ব্রহ্ম, তিনি সত্য চেতনা আনন্দস্বরূপ। অর্থাৎ সত্য অর্থে শুভ।

কিন্তু এই মঙ্গলের ধারণা কি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের মঙ্গলের ধারণার মত?

না।

আমাদের আটপৌরে মঙ্গলের ধারণা হল, পরীক্ষায় পাশ করলে, ভালো চাকরি পেলে, রোগ সেরে গেলে, মোকদ্দমায় জিতে গেলে। মোট কথা আমার ব্যক্তিগত জীবন ও আমার প্রিয়পরিজনদের নির্বিঘ্ন জীবনযাত্রাই আমার কাছে মঙ্গল। অর্থাৎ স্থায়ী সুখের পাকাপোক্ত বন্দোবস্তকেই আমি মঙ্গল বলি।

কিন্তু আস্তিক্যবাদের দার্শনিক সে তত্ত্বকে ছাপিয়ে যায়। তিনি বলেন, সৃষ্টি স্থিতি বিনাশানাং সে সত্য। তিনি বলেন, সুখে-দুখে, লাভে-ক্ষতিতে, হার-জিতে সর্বত্র তিনিই সত্য। সব মঙ্গলের মূলে তিনি।

এ অনেক বড় কথা। অনেক শোক, অনেক দুঃখে এ সত্যে মানুষের চিত্ত সান্ত্বনা পেতে পারে হয় তো। তার আগে অবধি সে এ তত্ত্বের বিরুদ্ধে তর্কই করে। কিন্তু সে তর্ক শুধুমাত্র ছায়ার সঙ্গে তর্ক। কারণ প্রত্যুত্তর দেওয়ার কেউ নেই যে। তাছাড়া যার অস্তিত্বই অস্বীকার করি তার সঙ্গে তর্ক জুড়লে প্রকারান্তরে তার অস্তিত্বকে স্বীকার করাও হয়ে পড়ে।

সত্য প্রকাশিত হবেই। এ কথাটা শুভ না অশুভ এ প্রশ্নের মূলেই একটা গলদ আছে। প্রশ্নটাই ভিত্তিহীন। সত্য সত্যের মর্যাদাতেই সত্য। তাকে স্বীকার করেই যা কিছু খাঁটি। আর তাকে অস্বীকার করেই যা কিছু ভ্রান্তি। ভ্রান্তি কি শুভ না অশুভ? এ প্রশ্নটাও আগের প্রশ্নের মত ভিত্তিহীন।

ভ্রান্তি এখন দশদিকে রক্তবীজের মত। ভ্রান্তি উৎপাদনের কারখানা বাড়িতে বাড়িতে, পাড়ায় পাড়ায়, দেশে বিদেশে। ভ্রান্তির আবেদন আমার ভাবালু প্রাণের দুর্বলতার কাছে, সজাগ বুদ্ধির কাছে নয়। ভাবালু প্রাণ আপাতদৃষ্টিতে দুর্বল নয়। কারণ তার হুঙ্কার দেওয়ার ক্ষমতা আছে। সে দুর্বল এই জন্যেই যে তার সত্যের সামনে টিকে থাকার ক্ষমতা নেই। কারণ সত্য নেই তার সত্তায়। প্রশ্ন হতে পারে জগতে যখন কোনো কিছুই স্থায়ী নয়, তবে তোমার সত্যের স্থায়িত্বের তত্ত্বই বা টেকে কী করে?

এর উত্তর সোজা। কোনো কিছুই সংসারে স্থায়ী নয়, সব পরিবর্তনশীল। সত্য সেই পরিবর্তনের ছন্দ। সঙ্গতি ও ধারাবাহিকতার ছন্দ। ধূপ জ্বলতে জ্বলতে যদি শেষ হয়, তবে সেই শেষ হওয়াটাই সত্য নয়, সে ধূপের ধোঁয়া আর ছাই হয়ে যাওয়াটাও ততখানিই সত্য।

ভ্রান্তিকে ভ্রান্তি বলে জানাই ভ্রান্তি থেকে বেরোবার একমাত্র পথ। কিন্তু সে পথ শুধু আমার বিচার বিবেচনার উপর নেই। আছে সময়ের হাতেও। যে যুদ্ধের পরিমণ্ডলে আমরা শ্বাস নিচ্ছি তা আজ ভীষণ আকার ধারণ করেছে আমাদের রান্নাঘরে তার তাপ এসে পৌঁছিয়েছে বলে। এর আগে লক্ষাধিক পাশবিক হত্যায় আমরা “আহা-উহু” করেই বিবেকের কর্তব্য সেরেছি। এইবার উদ্বেগে আমাদের রাতের ঘুম উড়েছে। কিন্তু যে ভ্রান্তিতে মানুষ ধ্বংসলীলা চালিয়ে নিজেকে অজেয়, অভ্রান্ত ভাবে, সেই ভয়ানক চালিকাশক্তি কবে থামবে কেউ বলতে পারে? না। এ অসহায়তা আমাদের ভবিতব্য। যে কালে জন্মেছি সে কালের আঁচ গায়ে লাগবে না তা কি হয়?

তবু আশার বাণী, সত্যের প্রকাশ হবেই। ভ্রান্তি ঘুচবে। এতটুকু বিশ্বাস আবার টিকে থাকবেই প্রায় নিভে যেতে যেতেও, পারস্পরিক সহাবস্থানের জন্য সহিষ্ণুতা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। সহিষ্ণুতা অসহিষ্ণু শুধু অসহিষ্ণুতার উপরেই। সত্যের প্রকাশ হবেই। আর সত্য বৈচিত্র্যময়তার পক্ষে। একের আধিপত্যের গল্প ভ্রান্তির আষাঢ়ে গল্প।