বংশী সাইকেলের দোকানে বসতে পারে না বেশিক্ষণ। কোমর ধরে যায়। চোখেও ভালো দেখে না। রেখা, মানে বউয়ের লেডিস টেলার্সে সারাটা সন্ধ্যে বসে কাটিয়ে দেয়। সাইকেলের দোকানটা একবেলাই খোলে। বংশী চা আনে। মুড়ি আনে। রেখার দিকে তাকিয়ে থাকে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে। বড় তাড়াতাড়ি বুড়িয়ে গেল সে। যৌবনের দিনগুলো মনে পড়ে। সে নিয়ে কোনো ক্ষোভ নেই। রেখা আর তার মধ্যে বোঝাপড়া ছিল জল-কর্পূরের মত। সারা শরীর-মন রেখার গন্ধে ভরে যেত। মানুষ শরীরে মুক্তি না পেলে মনে পায়?
আধখানা চাঁদ উঠেছে। বংশী তাকিয়ে। শিমুলগাছের ফাঁক দিয়ে চাঁদ দেখা যাচ্ছে। রেখার দিকে তাকালো। একজন মহিলার ব্লাউজের মাপ নিচ্ছে। বংশী বলল, চা নিয়ে আসি। আজ ঠাণ্ডা পড়েছে। দিদি আপনি খাবেন?
চায়ের দোকানে ভিড়। সে আসতেই জায়গা ছেড়ে দিল। বয়েস হয়ে গেছে সবাই মনে করিয়ে দেয়। খোকন বলল, সামনের মাসে পুরী যাচ্ছি, বৌদি আর তুমি যাবে?
বংশী বলল, বাসে? কোমর দেয় না রে।
খোকন বলল, আমিও তাই বলছিলাম রেখা বৌদিকে। দাদা পারবে না।
বংশী'র বিঁধল। চায়ের গ্লাস আর তিনটে ভাঁড় নিয়ে আসতে আসতে বলল, যাব। যাই হোক। যাব।
রেখা চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, মিষ্টিটা বেশি দিয়েছে খোকনদা।
বংশী বলল, পুরী যাচ্ছে…. যাবে? বলল, তুমি নাকি বলেছ আমার হবে না……
রেখা বলল, না না, অতক্ষণ পারবে নাকি! শেষে বেড়াতে গিয়ে তোমায় নিয়ে অস্থির হই। থাক।
বংশী জোর করল না।
রেখা চা'টা শেষ করে বাইরে এসে দাঁড়ালো। বংশী মাটির দিকে তাকিয়ে বসে। রেখা বলল, ভুগতে তো তোমাকেই হবে। জেদ করে লাভ কী?
বংশী বলল, আমার জন্য আটকে গেলে তুমি।
রেখা বলল, আবার সেই কথা….. আজ রুটি কিনে নিয়ে যাব। তুমি জয়শ্রীকে বলে রেখো। দোকান বন্ধ করে যেন চলে না যায়। আর গেলে রুটি যেন দিয়ে যায়।
বংশী চলে গেল। রেখা খোকনের দোকানে গিয়ে বলল, দাদাকে কী দরকার ছিল পুরীর কথা বলার….. এত কী চুলকানি তোমার?
খোকন মাথাটা নীচু করে চা ছাঁকতে ছাঁকতে বলল, বেশ করেছি।
রেখা ফিরে এলো। বংশী বসে আছে রাস্তার দিকে তাকিয়ে। কী অসহায় লাগে এক-একসময়। এসেই বলল, শোনো খোকনকে টাকা দিয়ে এলাম। আমরা পুরী যাচ্ছি। এত ভয়ে ভয়ে তুমি আরো জড়সড় হয়ে যাচ্ছ।
বংশী ভয় পেল। কোমরের না। বাসের ঝাঁকুনির না। কোথায় যেন একটা ঝাঁকুনি লাগল। ভয় লাগে। ভাঙা দেওয়ালের পাশে ঘুমানোর ভয়।