Skip to main content

 

333.jpg

 

জীবন তাকে বলেছিল, আর কয়েকটা ওভার ধরে খেল, তোমার যা ক্ষয়ক্ষতি সব পুষিয়ে দেব।

দেয়নি। এমনকি শেষটাতেও তিনজনের পর লাইন পেল। কাগজে লিখতে লিখতে, দাহের টাকা গুনে নিতে নিতে কর্মচারী বলল, ঠাণ্ডায় অনেকেই খালাস হয়ে গেছে দাদা।

সবাই চা খেতে এলো। একজন ভিখারি বলল, চা খাওয়াবে?

একজন বলল, খা।

এইটুকু বলতেই তার মুখ থেকে মদের গন্ধ বেরিয়ে এলো।

ভিখারি বলল, মাল খেয়েছ?

সে বলল, খাবি? বোতল আছে। আমাদের লাইন আসতে দেরি আছে।

সে বলল, থাক। দুটো বিস্কুট দাও।

দিল।

ততক্ষণে চাঁদ উঠেছে।

ভিখারি বলল, আজ মাগী পূর্ণিমা।

মাতাল বলল, এই অসভ্য। মাঘী, মাগী না।

ভিখারি জিভ কেটে বলল, মোটা জিভ, কী বলতে কী বলে ফেলি।

মাতাল বলল, ঠাকুরদেবতা মানিস না?

ভিখারি বলল, বাব্বা, পাড়ার দাদা মানি আর তাদের মানব না? কালী পুজোয় আমাদের কত টাকা চাঁদা দিতে হয় বলো তো?

কী বলিস রে শালা!

আর বলছি কী।

মাতাল বলল, লোভ আছে তোর?

ভিখারি বলল, লোভ আছে বলেই তো ভিখারি গো। নইলে কবে গঙ্গায় ঝাঁপ দিয়ে দিতাম। বাঁচার লোভ নেই?

মাতাল বলল, লোভ ভালো জিনিস না রে। হিংসাও না। এইখানে এলেই আমার এসব মনে হয়। মানুষগুলো কেমন হুসহুস করে পুড়ে যায় বল।

ভিখারি বলল, চলো ছাদে উঠি। ওই যে ফ্ল্যাটটা হচ্ছে। চলো। পড়ে মোরো না খালি।

মাতাল আর ভিখারি উঠল। ছাদে উঠে ভিখারি বলল, লাফ দেবে?

মাতাল বলল, তুই দিবি?

থাক। ভিখারি বসে বলল, বসো।

মাতাল বসে বলল, যে গেল, মানে যাকে নিয়ে এসেছি, ওর ইচ্ছা ছিল বড় আর্টিস্ট হবে। ভালো গান গাইত। কিন্তু চান্স পেল না কোথাও।

ভিখারি বলল, দুঃখ পেয়ে লাভ নেই। আমার সব ছিল একদিন। সব গেলও একদিন। আজ দেখো কোথায় আমি। কী করবে, নিয়তি। তবু দেখো তুমি আমি বসে চাঁদ দেখছি। ভালো লাগছে বলেই তুমি আমার সঙ্গে কথা বলছ। ছাদে উঠলে।

মাতাল বলল, কাল সকালে তোকেই চিনতে পারব না। কী আশ্চর্য না?

ভিখারি বলল, চুপ করো। আমি শোবো। আমার ভীষণ পেট যন্ত্রণা শুরু হল। এ হয়।

মাতাল বলল, আমি নামি তবে।

মাতাল নামল। তবে যেদিকে সিঁড়ি ভেবেছিল সেদিকে না।

ভিখারি বলল, আবার দেখা হবে। সেদিন কেউ কাউকে চিনতে পারব না।

যাকে নিয়ে আসা হয়েছে দাহ করতে সে এতক্ষণ ছাদেই বসেছিল। ছাদে বসে বসে একবার তার ফেলে আসা শরীরকে আর পূর্ণিমার চাঁদকে দেখছিল। মাতাল শরীর ছেড়ে তার পাশে গিয়ে বসল। নীচে তখন হৈচৈ হচ্ছে। রাত অনেক হল। ঠাণ্ডা বাতাস দিচ্ছে। তায় গঙ্গার জোলো হওয়া।

মাতাল বলল, চলে এলাম।

ব্যর্থ আর্টিস্ট বলল, চুপ। একদল বাদুড় এখন চাঁদের উপর দিয়ে উড়ে যাবে। কী ছবি হবে। আবার জন্মালে আমি ছবি আঁকব। গান গাইব না। না না গাইব, ছবি আঁকতে আঁকতে গান গাইব।

আবার না খেয়ে মরবি শালা।

তুইই বা আজীবন গিলে কী করলি? এই এখানে আমরা সেই পাশাপাশি বসে। আমাদের বডির জ্যাকেট ওই যে... দ্যাখ দ্যাখ নীচে দেখ, ওই যে। কী করলি?

মাতাল বলল, ও মালটা কেমন ঘুমাচ্ছে দেখ। শালা আজই যেন লটারির টিকিট জিতেছে।

হিংসা করিস কেন। শুয়ে থাকুক। ওর সময় হয়নি এখনও।

মাতাল বলল, এত এত দীর্ঘশ্বাস আজীবন ধরে। শালা কোনো মানে নেই? এই কালই ভেবেছিলাম বড় পার্টি আসছে, লাখ পঁচিশেক তো এ বছরের শেষে কামাই আছেই। শালা একটা ভুল মোড় নিতে সব শেষ?

আর্টিস্ট বলল, তোর শরীর নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। দেখ, দেখে আয়।

মাতাল চুপ করে গেল। খানিকবাদে বলল, পাপ বলে কিছু হয়? মাতালের গলার স্বর বদলে গেছে।

ভিখারি উঠে বসেছে কখন কেউ খেয়াল করেনি। তার গলা শুনে দুজনেই ফিরে তাকালো। সে বলল, পাপ বলে হয়।

মাতাল বলল, কী করে বুঝলে?

ভিখারি বলল, যেদিন ভোরের আলো ভালো লাগবে না, জানবে পাপ জমেছে।

ব্যর্থ আর্টিস্ট জিজ্ঞাসা করল, খালি পেটেও ভালো লাগে?

ভিখারি বলল, লাগে।

পুব আকাশ অল্প অল্প আলোকিত হতে শুরু করছে। আর্টিস্ট বলল, চলো।

মাতাল বলল, কোথায়?

আর্টিস্ট বলল, চলো, বলছি।

মাতাল বলল, দাঁড়াও, এক মিনিট। তারপর ভিখারির দিকে সোজা তাকিয়ে বলল, তুই আমাদের শুনতে পাস কী করে? তুই তো জ্যান্ত।

আর্টিস্ট বলল, চলো। ওর চোখে ভাব লেগেছে। ও শুনবে না। দেখছ না কেমন উৎসুক হয়ে সূর্য ওঠার অপেক্ষায়।

কিন্তু ও তো ভিখারি। ওকে এখানে আমি আগেও দেখেছি। ওর ভাব লাগে কী করে? পাগল না ঢং ওটা ওর?

আর্টিস্ট বলল, তোমার গায়ে এখনও শরীরী অহংকার। তুমি ভাবছ মানুষকে নিয়ে তোমার বিচার নির্ভুল। এই বড় ভুলটা সব অহংকারী করে। তুমিই বা বাদ যাবে কেন?

আলো ফুটল পুবকাশে। ভিখারি দুই চোখ বন্ধ করে আলোর দিকে তাকিয়ে বলল, সব থেকে দূরে, তবু সব থেকে কাছে, ওগো জীবন, আমার মধ্যে ডালপালা মেলে এসো।

মাতাল আর ব্যর্থ আর্টিস্ট যেখানে বসেছিল সেখানে একজন ইঞ্জিনিয়ার এসে দাঁড়িয়েছে। চেঁচিয়ে বলছে, আশ্চে মাসে ঢালাই, কাজে হাত লাগা। ভিখারির দিকে তাকিয়ে বলছে, নাম রে, নইলে পড়ে মরবি। গতকালই একজন মরেছে। কাজ আটকায়নি এই আমার চোদ্দোপুরুষের কপাল!

ভিখারি নামতে নামতে বলল, চা খাওয়াবে?

ইঞ্জিনিয়ার বলল, নীচে গিয়ে আমার নাম করে খেয়ে নে।

ভিখারি বলল, আচ্ছা।

সে নামতে যাবে, ইঞ্জিনিয়ার ডেকে বলল, নাম না জেনেই নামছ যে বড়...

ভিখারি হেসে ফিরে তাকিয়ে বলল, বলব ইঞ্জিনিয়ার সাহেব....ওই নাম।

ইঞ্জিনিয়ারের মুখে রোদ এসে পড়েছে। ঘামের উপর প্রতিফলিত হয়ে মুক্তোর মত লাগছে। সে মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল উত্তর শুনে। বলল, দুটো বিস্কুট নিয়ে নিস।