শ্রীকৃষ্ণ দিঘীর পাড়ে বড় নিমগাছটার তলায় যেখানে এসে বাঁশঝাড়টা শেষ হয়েছে সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন। অদ্বৈত মঠের আচার্য এলো স্নানে৷ এসেই চমকে উঠে বলল, একী! তুমি না নিরাকার! এমন সাকার হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার মানে কী?
শ্রীকৃষ্ণ হাসতে হাসতে দিঘীর জলে নেমে গেলেন। জল মুহূর্তে হল নীল। আচার্য সে জল মাথায় বুকে মেখে বললেন, শান্তি শান্তি।
কিন্তু আশ্রমে ফিরে অবধি মনের মধ্যে কী এক আলোড়ন। অমন হাসল কেন আমায় দেখে? আমি কি বোকা? কী এমন চতুর সে! হাসল কেন!
আচার্যের রাতে ঘুম ছুটল। দিনে নিত্যকর্মে ত্রুটি ঘটতে থাকল। থেকে থেকেই সে হাসিটা মনের মুকুরে ভেসে ওঠে। মুকুর নীল রঙ্গে টুপটুপ করে। কী করে এখন?
একদিন গভীর রাতে আচার্য এসে দাঁড়ালো দিঘীর পাড়ে। আধফালি চাঁদ জলে টলটল করছে। দিঘীর ওপারে আকন্দের ঝাড়। তার সুগন্ধ যেন এই পারেও এসে লাগছে। আকাশের দিকে তাকাতে চমক লাগল। যেন সে আধফালি চাঁদ মাথায় করে বসে আছে জগৎ জুড়ে মহাদেব। তার জটা থেকে নামছে সময়ের স্রোত। এই তো আদিগঙ্গা।
আচার্যের চোখের কোল ভিজে এলো। নিজেকে সামলে নিয়ে হাঁটতে শুরু করল। হাঁটতে হাঁটতে ভোর হল যখন এসে পৌঁছালো গন্তব্যে মুকুন্দারবিন্দ আশ্রমে। আশ্রমের মোহন্ত উঠান ঝাঁট দিচ্ছিলো। ছোটো আশ্রম সব নিজেদের করে নিতে হয়। তিনি আচার্যকে দেখেই দৌড়ে এসে পায়ে পড়লেন। বললেন, একী সৌভাগ্য আমার! আপনি এসে পায়ের ধুলো দিলেন! তাও নিজে থেকে!
আচার্য তাকে ধরে তুললেন। বললেন, কথা আছে একান্তে। সময় নেই। চলুন।
আচার্য আর মোহন্ত এসে দাঁড়ালো গঙ্গার ধারে। নিমগাছের নীচে বাঁধানো গোল করে। তারা বসল।
মোহন্ত বলল, বলুন।
========
সব শুনে মোহন্ত চুপ করে বসে। আচার্য গঙ্গার দিকে তাকিয়ে। এমন নিস্তব্ধতা নিজের আশ্রমেও অনুভব করেছে। কিন্তু ওই যে আশ্রমের মন্দির থেকে ভেসে আসছে কীর্তন…..
আচার্য স্তব্ধতা ভেঙে বলল, এ কার পদ?
মোহন্ত একটা বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, বিদ্যাপতি।
আচার্য বলল, বড় মধুর।
মোহন্ত চুপ করে বসে। আচার্য বলল, কিছু বলুন?
মোহন্ত বলল, কী জানি বলুন যে বলব। আপনি যা দেখেছেন সে সত্য। আপনার দ্বন্দ্ব - সেও সত্য। আপনি এর থেকে ত্রাণ চাইছেন, এও সত্য।
আচার্য অধৈর্য হয়ে পড়ে বলল, কিছু তো বলুন। সত্য কী তবে?
মোহন্ত বলল, দেখুন, এ প্রশ্নের উত্তর আমারও অজানা। বাস্তব আর সত্য কী, এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজা ছেড়েছি অনেক কাল হল।
আচার্য বলল, কিন্তু প্রশ্নটা কি আপনাকে ছেড়েছে?
মোহন্ত হাসল। বলল, দেখুন মানুষের বুদ্ধি এ জগতের নানা আখ্যান নানা যুগে করেছে। কেউ কোনো আদর্শের অনুরূপ ব্যখ্যা খুঁজেছে। যেমন আপাতভাবে আপনার আর আমার আদর্শ ভিন্ন। আমি লীলাবাদী, আপনি মায়াবাদী। তেমন কেউ কেউ যতটুকুর মধ্যে তার বুদ্ধি রুচি অনুযায়ী সাযুজ্য, সঙ্গতি ততটুকুই তার কাছে বাস্তব, ব্যখ্যার যোগ্য। আবার আরেক দল আছে। বিশ্বযুদ্ধের পর বিষাদ আর মোহভঙ্গের পালা এলো। একদল মানুষ বলল, সব ভাঙো। সব সঙ্গতি, সাযুজ্যের শৃঙ্খলা ভাঙো। হোক অসঙ্গতিপূর্ণ, হোক খাপছাড়া, হোক বেমানান - তবু তারই প্রকাশ হোক। সত্যের কাছাকাছি হয় তো সেই বেশি। এইভাবে জন্মালো পরাবাস্তবের জগত। এর উৎস পাশ্চাত্যের কিছু সৃষ্টিশীল সংবেদনশীল মানুষ।
আচার্য বলল, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় এই অধিবাস্তব বা পরাবাস্তব যাই বলুন তাতে মেতেছিলাম। মনে হয়েছিল কী গভীর সত্যের উন্মোচন যেন আমার সামনে ঘটতে চলেছে। পরে মোহভঙ্গ হল।
মোহন্ত বলল, মোহভঙ্গর ধারাবাহিকতায় ভেসে চলেছি আমরা।
দুজনে চুপ। একজন মহিলা এসে জিজ্ঞাসা করল, প্রভুর সেবার আয়োজন হয়েছে। অনুগ্রহ করে যদি আসেন।
মোহন্ত বলল, আসুন।
আচার্য মোহন্তের হাতটা ধরে আকুতির স্বরে বলল, আরেকটু বসি। এ স্বরে নিজেই নিজের কাছে চমকে উঠল আচার্য।
মোহন্ত বলল, দেখুন আচার্য, সৃষ্টি স্থিতি আর প্রলয় নিয়ে এ সংসার। প্রলয়কে মানি বলেই হয় তো আমরা দুটো বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতাকে সামলে নিয়েছি। সেই প্রাচীন দর্শনের শান্তির জলে আবার স্নাত হয়েছি।
আচার্য বলল, নাম রূপ তো সত্য নয়। যা সত্য তা মন আর বাক্যের পারে। এই তো জেনেছি। ধ্যান করেছি। শিখিয়েছি। তবে?
মোহন্ত বলল, কিন্তু এ তো অর্ধেক সত্য। এর পরের কথাটায় আছে না, সে সত্য আনন্দস্বরূপ। আনন্দেই তাকে জানা যায়। তবেই ভয় থেকে মুক্ত হয় মানুষ।
আচার্য বলল, কিন্তু আনন্দের কি রূপ হয়? সে তো নির্বিশেষ।
মোহন্ত বলল, নাম আর রূপ সত্য, আবার সত্য নয়ও। নাম আর রূপ যখন আড়াল তখন সে মিথ্যা। যখন সে প্রতিফলক তখন সে সত্য। আচার্য, আমার মনে হয় মানুষ যখন নিজের ক্ষুদ্রস্বার্থের মাপে সব কিছুকে দেখতে চায়, তখন এই নামরূপ হয় আড়াল। কিন্তু যখন ক্ষুদ্রস্বার্থ ছাপিয়ে দেখে, তখন সে পায় মাধুর্য। সে আর আড়াল নয় তখন। এ আমার ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে মনে হয়।
আচার্য বলল, ক্ষুদ্রকে ছাড়লে মহৎ এসে আলিঙ্গন করে, এ সত্য। কিন্তু সেই মহতের কি অবয়ব থাকা সম্ভব?
মোহন্ত বলল, সম্ভব তো নয়। কিন্তু মাধুরীর রসে মালাকারের ভাবে ভিন্ন ভিন্ন ফুল যেমন মালা হয়ে ওঠে, তেমন সেও আকার ধারণ করে, এই তো বুঝি। নইলে…..
আচার্য বলল, নইলে?
মোহন্ত বলল, দেখুন, আপনার উপলব্ধ দর্শন না থাকলে ধর্মে ধর্মে সংহতির বেদী রচনা হয় না। আপনার সে দর্শনই তো দেখিয়েছে যে নাম আর রূপের বাইরে সে অসীম, অগম্য। আমার বাক্য আর মনকে সে ধরে আছে বলেই তারা সাকার। কিন্তু সে নিজে সব ছাপিয়ে সে সব বিরোধের বাইরে। এ কথা কে শোনাতো তবে? কিন্তু এটাই একমাত্র কথা হতে পারে না। মায়ের মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে যদি কেউ কেবলই বাঁশ আর মাটির কথা ভাবে তবে সে তার মনের ভাবের দীনতা। কিন্তু যে অজন্তার গুহাচিত্রের সামনে দাঁড়িয়ে যুগ যুগান্তর প্রাচীন শিল্পীর ভাবের রঙে নিজের মনকে রাঙায় সেই মাধুর্যের অধিকারী।
মন্দিরের ঘণ্টা পড়ল। আচার্য চমকিয়ে উঠে বলল, কী দেরি করালাম আপনার। ছি ছি। আপনার নিত্যসেবায় বাধা দিলাম।
মোহন্ত বলল, নিত্যসেবায় বাধা নিত্য তো পড়ে না। পড়ল না হয় আজ। কিন্তু বিদ্যাপতির সে পদ শুনে, এখানে দুটো সেবা করেই যাবেন। আমার রাখাল ভালো রিকশা চালায়। আপনাকে ছেড়ে আসবে। আমাদের এ সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত করবেন না।
আচার্য দেখল মঠের এক কোণায় এক মহিলা বসে সব্জী কাটছেন। সে মহিলা ফিরে তাকালেন আচার্যের দিকে। আচার্যর চোখের কোল ভিজে এলো, ত্রিনয়নী হতে তিনটে চোখই কি লাগে? এ দৃষ্টিতে কোন চোখের মাধুরী তবে?