Skip to main content

 

333.jpg

কিছু মানুষের অনুভব হল তার ভিতরে যে পূর্ণতার ছবি তাকে ভালোবাসা যায়। সেই পূর্ণ যেন তার ভালোবাসা পাবে বলে মুখিয়ে আছে। কিন্তু সে তো নিজে অপূর্ণ। তবে? তার কাছে ভালোবাসার উপাদান কই? ভাবতে ভাবতে তার হৃদয়ের কেন্দ্রে জন্ম নেয় ভাব। সেই ভাব থেকে জন্মায় কবিতা, গান, ছবি।

ভারতের এই মাটিতে একদিন যখন ভক্তি আন্দোলনের ঢেউ উঠল, তখন অনেকে এই কথাটাই খুব জোর দিয়ে বলল কবি, তোমার আর তার মধ্যে সম্পর্ক নেই কেন? তুমি কীসব আচার বিচারে, অনুষ্ঠানে রীতিতে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছ? তোমার অভাবের বোধ নেই? তোমার নিজের অপূর্ণতার কান্না নেই? সেই কান্নার ভাষায় পদ রচনা করো না কেন? কে তোমার ওই স্তবস্তুতি শুনতে চাইছে? সে তোমার ভাবটুকু চাইছে। ভাবালুতা না। সে তো ফাঁকিবাজি। ধরা পড়ে যায় যে!

ভারতের সেই ভাবের ধারায় অনেকেই জীবন ফিরে পেল। বেঁচে থাকার আরেকটা কারণ খুঁজে পেল। তারা কেউ জিজ্ঞাসা করে না তোমার জাত কী, তোমার ধর্ম কী, তোমার উপাস্য কে? সে বৃন্দাবনের মাটিতে যেমন মীরা, সুরদাস, হরিদাসের পদাবলী শুনে বিহ্বল হয়, সে-ই দিল্লীর নিজামুদ্দিনের দরগায় সুফী শুনে অশ্রুসিক্ত হয়। তার অনুভব ভেদ টানে না। ভেদ ঘোচায়।

কিন্তু এদের সংখ্যা ভীষণ কম। কারণ এরা আজকালের ভাষায় “ভিজবল” বা দৃশ্যমান নয়। এরা তর্ক করে না। দল পাকায় না। একে অন্যকে গালি দেয় না। এসব থেকে এরা শত যোজন দূরে। তবে এদের দেখবে কী করে? মাটির কাছাকাছি নেমে এলে এদের দেখা যায়। এরা ধুলো ওড়ায় না। ধুলো মেখেই বসে থাকে। এরা বেঁচে থাকে বলেই সব মানুষ অবশেষে শোকের হাত থেকে মুক্তি পায়।

মানুষ ভালোবাসা না পেলে বাঁচে না, অর্ধসত্য। মানুষ ভালবাসতে না পারলে বাঁচে না, এই হল পূর্ণ সত্য। বৈষ্ণব কবি কী সুফী কবি যখন পরমের পায়ে আত্মসমর্পণের কথা বলে, তখন ভাবতে গেলে ভীষণ জটিল হয়ে পড়ে। পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ বোঝা যায়, কিন্তু এ কী ধরণের সমর্পণ? এ ভাবার বিষয় নয়। ভাবের বিষয়। মুজতবা আলী মহাশয় একটা পদ বলতেন। যার অর্থ হল গোলাপ কী পদ্মবনে জহুরী গেছে কষ্টিপাথর নিয়ে। গোলাপের পাপড়ি ছেঁড়ে আর পরীক্ষা করে। বলাবাহুল্য কোনো পরীক্ষাতেই সে ফুল উতরাতে পারে না।

কোনো কোনো মানুষের জীবনে এমন এক একটা সময় আসে যখন তাকে নিজের অস্তিত্বের সঙ্গে একটা বোঝাপড়া করতে হয়। নইলে নিজের সঙ্গে নিজের ভার ভীষণ হয়ে পড়ে। তখন তাকে হাজার তত্ত্ব দাও, দর্শন দাও, সে কিছুতেই শান্ত হবে না। বরং সেগুলো তাকে আরো অস্থির করে তুলবে। যে সেতারের তারের ঝংকারে স্নাত হবে বলে তৃষ্ণার্ত, তাকে সেতারের ইতিহাস আর সেতারের গঠন কৌশল বুঝিয়ে কী লাভ? সে ব্যাখ্যার কোনোটাই মিথ্যা নয়, কিন্তু গোটাটাই অসঙ্গত। কবির কবিতায় আর ক্লাসরুমে পরীক্ষার জন্য পড়ানো শিক্ষকের কবিতার ব্যাখ্যায় বিস্তর ফারাক। ক্লাসের কবিতার পাঠক ছাত্র। কবিতা তার জন্য লেখা তো হয়নি, হয়েছে রসিকের জন্য। সব ছাত্র কি রসিক? অগত্যা রস পড়ে থাকে ক্লাসরুমের বাইরে, আর টীকা ব্যাখ্যায় গমগম করে ওঠে ক্লাসরুম।

রসিক মানুষ আর কাজের মানুষ এরা দুজন একই মানুষ খুব কমই হয়। একে অন্যের ভাষাও বোঝে না। তাই দ্বন্দ্ব চলে চিরকাল। কিন্তু এ দ্বন্দ্বের বাইরে আরেকটা খোলা মাঠ আছে। যেখানে হৃদয় পৌঁছায় নিজেকে লুকিয়ে একা। উপনিষদের কবি যেমন গেয়েছিলেন, মন আর বুদ্ধি যাকে না পেয়ে ফিরে আসে তাকে হৃদয় পায় আনন্দে বিশ্বের অণুতে পরমাণুতে। মানুষ নিজের হাত থেকে নিজেকে মুক্ত করে প্রসন্নতায়। প্রসন্নতা ভালোবাসা পেলে আসে না, ভালবাসতে পারলে আসে। ভালোবাসব কাকে? এ হিসাবের প্রশ্ন। এ প্রশ্ন প্রেমিকের না। এ প্রশ্ন চতুরের। ভালোবাসতে পারছি না কেন, এ প্রশ্ন প্রেমিকের। সুফী কবি থেকে বৈষ্ণব পদকর্তা বলেন, ভালোবেসে যাওয়ার ক্ষমতা যদ্দিন না হারিয়ে ফেলছ, ততদিন সব ঠিক আছে, শেষরক্ষা হবেই। কিন্তু ভালোবাসার ক্ষমতা হারিয়ে ফেললে সব থাকলেও তুমি শূন্যের কারাবরি। শেষে হাহুতাশ। অন্তিম প্রশ্ন, সে ক্ষমতা পায় কী করে মানুষ? কবি তখন উত্তর দেয়, ঠিকানা হারালে গুরু এসে দাঁড়ায়। গুরু বাউল হবে। তোমায় বাউল করবে। এই জগত খোলস ছেড়ে আরেক জগত হবে, তুমিও।