জানলাটা বন্ধ করল। দুবার। প্রথমবার মনে হল জোরে আটকায়নি। তাই আবার জানলাটা খুলে আবার জোরে চেপে বন্ধ করল। দোতলার ঘর। দোতলায় তিনটে শোয়ার ঘর। একটা বসার ঘর। আর বাথরুম। সব ঘরে আলো জ্বালানো। সাধারণত অন্য সময় হলে জ্বলত না। আজ দরকার। সন্ধ্যে সাতটা কুড়ি বাজে।
নীচে রান্নাঘর। ছেলের পড়ার ঘর। পাশে শোয়ার ঘর। একটা গেস্টদের জন্য ঘর। যেখানে এখন বাইকটা রাখা। আর বাথরুম।
নীচের ঘরে নেমে এল। নামতে কষ্ট হয়। হাঁটু দুটো জবাব দিচ্ছে। কিন্তু না নামলে হবে না। কলিংবেলটা প্রথমবার মনে হয়েছিল বাজল। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এও মনে হল, হয় তো শোনার ভুল। কান তো কলিংবেলের শব্দই শুনতে চাইছে। ওর বাবা চলে যাওয়ার পর তো দরজা সে-ই খুলত। চীৎকার করত, দাঁড়া, আর বাজাবি না, আমার হাঁটতে সময় লাগে, উপরে আছি। তাও বদমাইশটা ইচ্ছা করে বারবার বাজাত। তাকে উত্যক্ত করার জন্য। ভালো লাগত। রাগও হত।
কলিংবেল সত্যিই বাজল। ঝুমা এসেছে। রান্নার মেয়েটা। নীচে নামতে নামতেই রজনীগন্ধার গন্ধ আসতে শুরু করল নাকে। বাবুর ছবিটা ওর ঘরের খোলা দরজা দিয়ে দেখা যাচ্ছে। চেয়ারে রাখা। সাদা তোয়ালের উপর। বাবু তার দিকে তাকিয়ে। চন্দনের টিপগুলোর ছায়া পড়ছে ছবির ফ্রেমের কাঁচটা ভেদ করে। ছবিটা দার্জিলিং এ তোলা। ম্যালে। ওর বাবা চলে যাওয়ার পর মা ছেলের প্রথম ট্যুর। ও তখন কলেজে ফার্স্ট ইয়ার। আজ থেকে চার বছর আগে।
দরজাটা খুলতেই কানে তালা লেগে যাওয়ার অবস্থা। প্রচণ্ড জোর মাইক বাজছে। পাড়ায় আজ সরস্বতী পুজোর দ্বিতীয় দিন। দরজাটা বন্ধ করতে করতে শুনতে পেল ঝুমার গলা....এবারে ওরা মাইকটা না বাজালেই পারত.....
কিছু না বলে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে মনে হল, তাকে সেজো বোন অনেকবার বলেছিল তার কাছে গিয়ে থাকতে। ওদের পাড়াটা নিরিবিলি। যদি যেত সে, যদি এই এ বাড়িটা ফাঁকাই থাকত, এই রাস্তা, এই গলি, এই মোড়, এই গাছ, এই ল্যাম্পপোস্ট, এই আশেপাশের বাড়ি, এই ভাঙা কলটা... এ সবের কারোর ওকে মনে পড়ত না? কারোর কোনো শোক হত না? শোক এত ব্যক্তিগত? শোক এত উদ্বায়ী? হয় তো বা।
বিছানায় টানটান হয়ে শুল। মাইকের আওয়াজ জানলা কাঁপিয়ে আসছে। গা গুলাচ্ছে। মাথাটা ধরেছে। কী করবে? চলে যাবে কোথাও?
ঝুমা চা নিয়ে উঠল। বলল, মাসিমা মাথাটা ধরেছে?
ঝুমার দিকে তাকাতে গাল গড়িয়ে দু বিন্দু জল গড়িয়ে পড়ল। চায়নি। তাও।
ঝুমা খাটে বসল। মাথাটা নীচু। একটু পর বলল, গঙ্গার দিকে যাবে? চলো...আমি ওকে বলছি টোটোটা নিয়ে আসতে.....চলো।
যে শাড়িটা পরেছিল ঘরে, সেটা পরেই টোটোতে বসল। পাশে ঝুমা। টোটো চলছে। একটার পর একটা পুজো পেরিয়ে যাচ্ছে। সঙ্গে তুমুল শব্দ মাইকের। মানুষ এত আওয়াজ ভালোবাসে? রবীন্দ্রনাথের কথা মনে পড়ল। শমী, ছোট ছেলেকে দাহ করে শান্তিনিকেতন ফিরছেন। রাতে দেখলেন ট্রেনের জানলা দিয়ে জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে ধরিত্রী। মনে হয়েছিল তার ব্যক্তিগত শোকের কোনো চিহ্ন তো নেই এতবড় বিশ্বে।
চোখটা বন্ধ করল। মনে হল, এ তো গেল প্রকৃতির কথা। প্রকৃতি তো নৈর্ব্যক্তিক। কিন্তু মানুষ? সে কী করে এমন হয়? এতগুলো মানুষ পুণ্যের লোভে একে অন্যকে দলে মেরে ফেলল। মৃত্যুকে এত হেলায় এড়িয়ে যাওয়া যায়? এত দ্রুত গতিতে এগোচ্ছে মানুষ? কোনদিকে?
গঙ্গার ধারে বসল। ঝুমা বলল, চা খাবে?
আন.....তোরা গল্প কর। আমি একটু একা বসি।
গঙ্গার ধারে একা বসে। পাশে এসে বসল ছেলে। বলল, মা, এসে ভালো করেছ, অত শব্দে আমার কষ্ট হচ্ছিল। তোমার হৃৎপিণ্ডের শব্দটা শুনতে পাচ্ছিলাম না। জন্মের আগে থাকতে চেনা শব্দ মা। এ পারে এসেও ওই আমার সুতো, তোমাকে চেনার। হৃৎপিণ্ডের শব্দটা তোমার যেদিন থেমে যাবে, সেদিন আমিও হারিয়ে যাব। ভালো করলে একা বসে। আমি শুনি। তুমি শান্ত হও। আমি আছি।